রবিবার, এপ্রিল ০৪, ২০১০

জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষায় ভাষা মাধ্যম (ৈদিনক েডসিটিন ২৭-০২-২০১০)





মাহফুজুর রহমান মানিক
জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষায় ভাষা মাধ্যম
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসের আন্দোলনকে অনেকে বলেন ভাষা আন্দোলন। শুধু ভাষা আন্দোলন বললে ভাবটা পূর্নাঙ্গ হয়না, বলা উচিত রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন। ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। এ বছরের একুশ তারিখ সবে গত হলো। অবশ্য ফেব্রুয়ারি এখনও বিদ্যমান। ফেব্রুয়ারির সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা যে বাংলা পেয়েছি, সে সংগ্রাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের সকল দেশ দিবসটি পালন না করলেও তারা জানে একুশে ফেব্রুয়ারিকে। অনেক দেশ দিবসটি পালনও করে। এ ফেব্রুয়ারি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, চেতনা আর গর্বই নয়। আমাদের কন্ঠ, আলাদা জাতিসত্তার পরিচয়, স্বাধীন পতাকার সূতিকাগারও বটে।মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে প্রত্যেককে কথা বলতে হয়। প্রয়োজন পূরণে ব্যবহার করতে হয় ভাষা। পরস্পরের ভাব আদান প্রদানে, যোগাযোগে, চলতে-ফিরতে সর্বত্র ভাষার প্রয়োজন। ভাষা ব্যবহারের সবচেয়ে বড় যে ক্ষেত্র সেটি শিক্ষা। শিক্ষাগ্রহণ ও প্রদানে ভাষার ব্যবহার অনস্বীকার্য। শিক্ষার উপাদান হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান, বই ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয়। এর বাইরে ভাষা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকেরই দৃষ্টি গোচর হয় না। ভাষার মাধ্যমেই একজন শিক্ষক শিক্ষা দেন। এ ভাষার বিষয়কে শিক্ষাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন’। এ মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন বা শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে ভাষার সার্থক ব্যবহারের মাধ্যমেই শিক্ষায় সফলতা আসে। স্বাভাবিকভাবেই এ ভাষা মাধ্যম শিক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।আমাদের দেশে এ ভাষা মাধ্যম নিয়ে খুব কমই মাতামাতি হয়। ব্যতিক্রমটা ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ এ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে ভাষা মাধ্যম নিয়ে কিছু আলোচনা শোনা যায়।পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশেই নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা দেয়া হয়। আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সংগ্রাম করে আমরা বাংলা পেয়েছি। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাই আমাদের শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত। এ শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে এবারের শিক্ষানীতির নির্দেশনা কী? এর বাস্তবতাইবা কতটুকু ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার প্রয়াস চালাচ্ছি। (যদিও শিক্ষানীতি এখনও খসড়াই রয়ে গেছে। চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।)শিক্ষানীতিতে ভাষা মাধ্যম বা মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশনের দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাস্তর অনুযায়ী দেখা যাক। শিক্ষাস্তর তিনটি হলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। অবশ্য প্রাথমিকের আগে প্রাক-প্রাথমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের আগে বলে প্রাক-প্রাথমিকের আলোচনা প্রথমেই এসেছে। এ স্তরে ভাষার কথা স্পষ্ট না থাকলেও শিক্ষাদান পদ্ধতি এসেছে। শিক্ষানীতির দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কৌশল শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘অন্যান্য গ্রহণযোগ্য উপায়ের সঙ্গে ছবি, রং, নানা ধরনের সহজ আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ, মডেল, হাতের কাজের সাথে সাথে ছড়া, গল্প, গান ও খেলার মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হবে।’আসি প্রাথমিক শিক্ষায়। প্রাথমিক শিক্ষায় ও ভাষা মাধ্যম নিয়ে স্পষ্ট কিছু নেই। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্যে শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং আদিবাসিদের ভাষা নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে। সংশ্লিষ্ট তিনটি লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো-‘মানবিক বিকাশ এবং দেশজ আবহ ও উপাদান ভিত্তিক পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং অনুসরন করা।কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা হবে।প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আদিবাসি সহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।এরপর প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবস্তু শিরোনামে কিছু নির্দেশনা দেয়া আছে, এখানে বাংলার কথা বলা না থাকলেও ইংরেজির কথা বলা হয়েছে, ‘মানসম্পন্ন ইংরেজি লিখন কথনের লক্ষ্যে যথাযথ কার্যক্রম শুরু থেকেই গ্রহণ করা হবে এবং ক্রমান্বয়ে ওপরের শ্রেণীসমূহে প্রয়োজন অনুসারে জোরদার করা হবে।’মাধ্যমিকের ব্যাপারে শিক্ষানীতির চতুর্থ অধ্যায়ে বিবৃত হয়েছে। এ স্তরের কৌশল শিরোনামে প্রথমেই এসেছে শিক্ষার মাধ্যম। বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার মাধ্যম এই পর্যায়ে মূলত বাংলা হবে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামর্থ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষা দেয়া যাবে। বিদেশীদের জন্য সহজ বাংলা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্চনীয়।’মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষা। উচ্চ শিক্ষায় ভাষা নিয়ে আলোচনা এসেছে উচ্চশিক্ষার কৌশল হিসেবে। অনেকগুলো কৌশলের মধ্যে দুটি কৌশল ভাষা সংক্রান্ত। এর একটি হলো, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সকল ডিগ্রি কোর্স পর্যায়ে ১০০ নম্বরের / ৩ ক্রেডিট ইংরেজি বিষয় সকল শিক্ষাথীর জন্য বাধ্যতামূলক হবে।’অন্যটি হলো-‘উচ্চশিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি হবে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের। উচ্চশিক্ষায় বাংলা সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ইংরেজিসহ অন্যন্য ভাষায় রচিত আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলা ভাষায় ভাষান্তরিত হওয়া প্রয়োজন। এই কাজকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির ব্যবহার চালু থাকবে।’ভাষা বিষয়ক সুপারিশের কথা বললে গোটা শিক্ষানীতিতে এই ছিলো বর্ণনা। এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বললেও স্পষ্ট করার বিষয় হলো সকল স্তরের ভাষা মাধ্যম হবে বাংলা। সকল স্তরে বাংলার সাথে যে ভাষার প্রয়োজন ছিলো তা বলা হয়েছে। যেমন আদিবাসিদের ভাষার কথা এসেছে, ইংরেজির ভূমিকাও কয়েক স্থানে বলা হয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, এসব ভাষা বিষয়ক সুপারিশমালার মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে, শিক্ষার মাধ্যমের বিশেষ কোন গুরুত্ব এ শিক্ষানীতিতে নেই। কারণ এ বিষয়ে যা বলা হয়েছে সবই এমন ঢিলেঢালা, যার নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা করণীয় নির্ধারণ করা হয়নি।শিক্ষানীতির এসব সুপারিশের আলোচনা বাস্তবতার আলোকে দেখা যেতে পারে।প্রাক-প্রাথমিকের ভাষার কথা বলি আর বইয়ের কথা বলি, এখানে বলা হয়েছে ছবি, রং, সহজ শিক্ষা উপকরন আর ছড়া গল্পের কথা। মূলত: এ স্তরটিকে দেখানো হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতির স্তর হিসেবে। শহরে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় প্রাথমিকের আগেই তিনটি শ্রেণী কেজি, নার্সারী ইত্যাদি নামে এসব ক্লাসে শিক্ষানীতিতে বিদ্যমান কৌশলগুলো তো বস্তবায়ন হয়ই না বরং অনেক বোঝা শিক্ষার্থীদের মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়। আড়াই থেকে তিন বছরেই স্কুলে যাচ্ছে শিশুরা। বাংলা তো বটেই ইংরেজির নানা বইও শিশুদের পড়ানো হয়। শিক্ষানীতি এ স্তরের জন্য কোন কারিকুলাম করেনি। খেলাধুলা বা মজার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে আসার অভ্যাস করানোর উদ্দেশ্য হলেও বাস্তবতা তো আমরা দেখছি।প্রাথমিক শিক্ষায় আসা যাক। এখানে ভাষা মাধ্যম হিসেবে বাংলার কথা স্পষ্ট না হলেও ‘দেশজ আবহ’ বলে একটা শব্দ এসেছে। এর দ্বারা শুধু বাংলাকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সাথে সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ইংরেজি বলা ও লেখার জন্য কার্যক্রম নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর সাথে আদিবাসিদের মাতৃভাষায় শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষা দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রত্যেক মানুষেরই মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চার অধিকার আছে। আমাদের শিক্ষানীতি আদিবাসিদের তাদের মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে সে অধিকারকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে। তারা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা শিখবে মাতৃভাষা হিসেবে নিজেদের ভাষাতো আছেই।শিক্ষানীতি যে দেশজ আবহ ও উপাদান ভিত্তিক পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং অনুসরণ করার কথা বলেছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে, আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। একে তো বাংলার বা বাংলা ভাষার ছোঁয়া তো এখানে নেই, পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ-সংস্কৃতি সবই শেখানো হচ্ছে বাইরের বিশ্বে। শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে বসেই লালন করছে অন্যদের সংস্কৃতি। একটি বাস্তব ঘটনার কথা বলা যেতে পারেÑ বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর উপর দিয়ে যাচ্ছে বাবা আর ইংলিশ মিডিয়ামে পড়–য়া ছেলে। বাবা ছেলেকে সেতুটা দেখিয়ে বলছে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেতু আর যে নদীটা দেখছো এটি দেশের অন্যতম বড় নদী। ছেলে বাবার কথা শুনে বলেছে, নদীটি নিশ্চয়ই টেমস নদীর চেয়ে বড় হবে না? অর্থাৎ ছেলে যে টেমস নদী পড়ে এসেছে সেটাই তার কাছে বড়, টেমস যমুনার চেয়ে যতই ছোট হোক না কেন।এ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ব্যাপারে শিক্ষানীতির ভূমিকা নিরব দর্শক বৈ কিছু নয়।শিক্ষানীতি প্রথম শ্রেণী থেকেই যে ইংরেজি বিষয়টি পড়ানোর কথা বলেছে তা নিয়ে অনেকেরই দ্বিমত রয়েছে। শিক্ষাস্তরের প্রথম থেকেই মাতৃভাষার বইতে এসে অন্য একটি ভাষা শিক্ষার্থীদের মাথায় উঠিয়ে দেয়া। একেতো বোঝা তার ওপর ভিন দেশি ভাষা। উন্নত বিশ্বের কোন দেশে প্রাথমিক স্তরেই মাতৃভাষার বাইরে অন্য ভাষা এভাবে শিখানো হয় না। জাপান, ফ্রান্স, স্পেন, রাশিয়া যার প্রকৃত উদাহরণ। যারা সাধারণ শিক্ষায় ইংরেজিই মেনে নিতে পারছেন না, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মেনে নেয়ারতো প্রশ্নই উঠে না। এসব স্কুলের ব্যাপারে শিক্ষানীতির একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিলো। অন্তত ইংরেজি ভাষায় আমাদের প্রাথমিকের সিলেবাসগুলো অনুবাদ করে বাধ্যতামূলকভাবে সকল প্রতিষ্ঠান পড়াবে। (এখনও কিছু কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে এ পদ্ধতি চালু আছে।) আর বাংলা বিষয়টা বাংলার শিক্ষক পড়াবে। এক্ষেত্রে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো যে আন্তর্জাতিক মান আনুসরণ করে আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোও সে মানেই তৈরি হবে।মাধ্যমিক স্তরে এসে স্পষ্টভাবে প্রখম বাংলার কথা এসেছে, ‘শিক্ষার মাধ্যম এই পর্যায়ে মূলত বাংলা হবে, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামর্থ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষা দেয়া যাবে’। অর্থাৎ এ নীতি অনুযায়ী এ স্তরের মাধ্যম বাংলা। কিছু বিষয় ইংরেজিতে শিক্ষা দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সামর্থ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছে শিক্ষানীতি তা স্পষ্ট নয়। তবে এর দ্বারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল যে বুঝানো হয়নি তা স্পষ্ট। নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি বলতে প্রাথমিক স্তর থেকে যেসব বিষয় ইংরেজিতে পড়ে আসছে সেগুলোই বুঝাবে এর সাথে হয়তো কিছু বিষয় বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে বলা যায় মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষানীতি স্বীকৃত ভাষা মাধ্যম দুটি বাংলা এবং ইংরেজি।উচ্চশিক্ষায় ভাষা মাধ্যম হিসেবে মাধ্যমিকের মতো বাংলাটা এতো স্পষ্ট নয়। তবে বাংলার কথা এসেছে আন্যভাবে। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ লেভেলের উচ্চশিক্ষায় ইংরেজিতে নির্দিষ্ট ক্রেডিট পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাংলার ব্যপারে এমন কোন ক্রেডিট বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে বাংলাকে সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করতে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষার গুরুত্বপুর্ণ রচনা বাংলায় ভাষান্তরিত করতে সুপারিশ এসেছে। উচ্চশিক্ষায় দুটি ভাগ দেখা যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন বাংলা ধরা হলেও বিভাগ আনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যায়। যে বিষয়টি প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষা শিরোনামের প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন, ‘সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাংলার স্থান প্রায় নেই। অর্থনীতি বা হিসেব বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগ কিছুটা বেশি শক্তিমান, তাই সেগুলোতে বাংলার স্থান প্রায় নেই’। আর আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো বাংলা পাওয়াই দুষ্কর। ইংরেজি বলতে পারুক না পারুক অন্তত বাংলা চলে না। অবারও হুমায়ুন আজাদ ‘বাংলাদেশের অসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় বা মহাবিদ্যালয়গুলো অবস্থিত অনেকটা বাংলাভাষা এলাকার বাইরে; সেখানে বাংলার অধিকার নেই; কারণ সেগুলো খুবই শক্তিমান’।পড়ার বিষয় হিসেবে বাংলা প্রাইভেট বিশ্ববিদালয়ে নেই। কর্পোরেট মার্কেট চাহিদার বিষয়টি মাথায় নিয়ে বিবিএ ইংরেজি এমন দু’একটি বিষয় নিয়েই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষানীতির এ ব্যাপারে তেমন কোন মাথাব্যথা পরিলক্ষিত হয়নি।ভাষা মাধ্যম নিয়ে চূড়ান্ত কোন কথা বলা না গেলেও বলা যায়, এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন নীতি নেই। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীরা বাংলা পড়ে আসছে, তার সাথে ইংরেজির লেজ তো লাগানো আছেই। এরপরও শিক্ষার্থীরা বাংলা ব্যবহার করতে জানে না, ইংরেজি তো অনেক দূরে। এর অর্থ ভাষা নিয়ে আমাদের পরিকল্পিত কোন চিন্তা নেই। গল্প কবিতার সিলেবাস বাস্তব ময়দানে কোন কাজ দেয় না। ভাষার যে চারটি দক্ষতা আছে শোনা, বলা, পড়া এবং লেখা এগুলোর আলোকে বাস্তবধর্মী সিলেবাস প্রণয়ন করা দরকার। এ লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে কম্যুনিকেটিভ পদ্ধতিতে ইংরেজি বিষয়টি চালু হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ইংরেজি ভাষার দক্ষতাগুলো আয়ত্ত আসার কথা থাকলেও কাংখিত ফল কিন্তু আসেনি। সমস্যাটা শিক্ষাদানে। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে যেসব শিক্ষকরা পাঠ দেন, তাদের অধিকাংশেরই ইংরেজির এসব দক্ষতা বলতে গেলে শূন্য। ফলে পরীক্ষায় পাশ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। আবার বাংলায় শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে মানভাষা ব্যবহার করেন না। শিক্ষার্থীরাও শিখে না।উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের মতো শুধু আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসে একমাত্র শিক্ষার মাধ্যম করা সম্ভব নয়। তবে অনেকে এ কথা মানতে নারাজ। বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রযুক্তির পৃথিবীই বলি আর বিশ্বায়নই বলি গ্লোবাল ভিলেজে শুধু বাংলা নিয়ে বেঁচে থাকা বা সামনে এগিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। জাপান, ফ্রান্স, রাশিয়া বা অন্যান্য দেশ কিভাবে সম্ভব করেছে? প্রশ্নটা অস্বাভাবিক নয়। এসব দেশ তাদের মাতৃভাষাকে নিয়ে বিশেষ টার্গেটে এগিয়েছে। নিজেদের ভাষায় যেমন আধুনিক বিশ্বেও আপডেট গ্রন্থ রচনা করেছে। তাদের ভাষা ছাড়াও অন্য যে ভাষাতেই উন্নত কোন বই বা প্রকাশনা এসেছে সাথে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেছে। তাদের শিক্ষার্থীরা গোটা পৃথিবীর আপডেট জ্ঞানকে নিজের ভাষায় পেয়েছে। মাতৃভাষার মাধ্যমেই উন্নতি করেছে।আমাদের বাংলায় সমৃদ্ধ সাহিত্য বা বইয়ের অভাব নেই বটে কিন্তু এর বাইরে এর চেয়ে অনেক প্রকাশনা রয়েছে। যা আমরা বাংলায় অনুবাদ করতে পারিনি। পৃথিবী যত দ্রুত এগুচ্ছে সকল জ্ঞান ভা-ারকে বাংলায় অনুবাদ করে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষায় কৃষির কথা বলি, যারা দেশের মাটি, ফসল, খাদ্য নিয়ে গবেষণা করছে তাদের ইংরেজিতে রচিত বই পড়তে হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষায় বাংলায় কয়টা বই আছে? প্রকৌশলে কিংবা অন্যন্য বিষয়ে বাংলার কয়টা বই আমরা পাব?মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনেকেই জোর গলায় কথা বলেন। সেটা হলে ভালোও হতো, আমরা নিজেদের ভাষায় পড়ে দ্রুত উন্নতি করতে পারতাম। বিশ্বপরিক্রমায় বর্তমান পর্যায়ে সৎসাহস নিয়ে এ কথা বলাটা কঠিন। এ সাহস দেখানো যেতে পারে এখন থেকেও যদি পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হওয়া যায়। রিস্ক থেকেই যাবে, তবুও চ্যালেঞ্জ নেয়া যেতে পারে। প্রথম কাজটা হতে পারে ব্যুরো অব ট্রান্সলেশন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুবাদ সংস্থা গড়ে তোলা। যেটি আধুৃনিক বিশ্বের জ্ঞান ভা-ারকে অনুবাদ করবে। দ্রুত গতিতে এ কাজকে এগিয়ে নিতে আমাদের মেধাবীদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে কিংবা প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাজে লাগানো যেতে পারে। অনুবাদ বা ভাষান্তরের বিষয়টি শিক্ষানীতিতেও এসেছে,’ উচ্চশিক্ষায় বাংলা সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষার রচিত আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলা ভাষায় ভাষান্তরিত হওয়া প্রয়োজন।’এছাড়া আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থায়ও অগ্রসর হওয়া যায়। বাংলা এবং ইংরেজি যেভাবে শিক্ষার্থীরা একসাথে শিখছে সেটা থাকবে, তবে কারিকুলাম হবে বাস্তবমুখী। প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তর শেষ করার পর উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি পড়তে যাতে কাউকে হোচট খেতে না হয়। সে কারিকুলাম শিক্ষার্থীর বয়স, মনন, বুদ্ধির আলোকে বাস্তবমুখী হবে। এর সাথে যোগ্য শিক্ষকম-লীরও সমাবেশ ঘটানো যেতে পারে। ২১ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করেছেন। এ ইনস্টিটিউট সত্যিকারার্থে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে গবেষণা করে, বাংলাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। শিক্ষানীতি আমাদের ভাষা মাধ্যমে যে কৌশল নির্ধারণ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং এ নীতি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী কিছু ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে শিক্ষার মাধ্যমকে শক্তিশালী করা যায়।

বন্ধ হয়নি সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা (ৈদিনক েডসিটিন ১৭-০২-২০১০)




বন্ধ হয়নি সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা
মাহফুজুর রহমান মানিক

ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আয়তনে ভারত বাংলাদেশের চাইতে কয়েক গুণ বড়। ভারত যেমন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশও তেমন। আয়তনে বড় বলে তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ-এর এ অধিকার নাই যে তারা বাংলাদেশীদের হত্যা করবে। আশ্চর্য়ের বিষয় হলো যখন আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন ঠিক তার প্রাক্কালে এবং সে দেশে আবস্থানকালীন সময় ও বিএসএফ আমাদের নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। গত মাসের ১০ জানুয়ারি ছিলো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, এর আগের দিন ৯ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বেনাপোল সীমান্তে মনিরুল ইসলাম এবং হজরত আলী নামে দুজনকে হত্যা করে বিএসএফ। এদের একজন নিরীহ কৃষক আরেকজন গরু ব্যবসায়ী। আগে যেটা দেখা যেতো শুধু গুলি করে হত্যা, এবার পিটিয়েই হত্যা করেছে গরু ব্যবসায়ীকে। ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ভারত গেলেন। ১২ তারিখ তিনি তখনও ভারতে সে অবস্থায়ও দৌলতপুর সীমান্তে ১ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে ১ জনকে। ১৩ তারিখ প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ করে বাংলাদেশে আসেন সেদিন সাতক্ষীরা সীমান্তে ১ জন নিহত হয় বিএসএফ-এর হাতে।আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে অন্তত কয়দিনের জন্য হলেও এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা যেতো। যাই হোক প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল। প্রধানমন্ত্রী তার সফরে নিশ্চয়ই বিএসএফ-এর এ খুনি আচরণ বন্ধের বিষয়টি উল্লেখ করছেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁর সফরের আগে, সফরকালীন সময়ে এবং এর পরের বিএসএফ-এর সে নিরীহ মানুষ হত্যার চিত্রের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং বেড়েই চলেছে খুনের পাল্লা। গত ১৪ তারিখ রোববার এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ৩০ জানুয়ারি, ২৮ জানুয়ারি ও এ হত্যাকা- হয়েছে। কাউকে মেরেছে গুলি করে আবার কাউকে পিটিয়ে।শেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ-এর অতর্কিত গুলিতে এক মহিলাসহ আহত হয়েছেন চার বাংলাদেশী। সীমান্তের একই স্থানে ৪ ফেব্রুয়ারি গুলি চালিয়ে এক বিডিআর সদস্যকে হত্যা করে বিএসএফ। লাশ নিয়ে যাওয়ার একদিন পর ফেরত দেয় তারা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরও আগের হিংস্রতা কমেনি। ইড়ঃঃড়স ড়ভ ঋড়ৎসএর আগে এ সমস্যার সমাধানে গত ১০ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই বিডিআর ও বিএসএফ-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক হয়। ঢাকার বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় অনুষ্ঠিত হয় এ বৈঠক। বৈঠকের সফলতার কথা বলেছিলেনন দুই মহাপরিচালক-ই। বৈঠক সফল হলেও কতটা সুখকর হয়েছে তাই প্রশ্ন। প্রথম দিনের ঘটনা ছিলো সত্যিই দুঃখজনক। তিন দিনের বৈঠকের বসতে না বসতেই খবর বিএসএফের গুলিতে দুজন বাংলাদেশি নিহত। আশ্চর্য বৈ কি! নিস্ফল দুটি প্রাণ। কোনো কারণ নেই। একজন কৃষক। মাঠে কাজ করছেন। হঠাৎ বিএসএফের গুলি। সাথে সাথে প্রাণ হারান। অন্যজন ব্যবসায়ী। গরু কিনে বাংলাদেশে আসছেন। বিএসএফের গুলিতে তিনিও প্রাণ হারান। নিরীহ প্রাণগুলো ঝরে যাচ্ছে। নির্বিকার বিএসএফ। বৈঠক হয়েছে অনেক। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিএসএফ দাবি করেছে নিহতদের মধ্যে ৮৫ ভাগই অপরাধী। গুলির যত ঘটনা ঘটেছে সবই রাতে। বিএসএফ বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। ভারতের সীমান্ত রক্ষায় অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে তারা। শ্রদ্ধা করি তাদের। কিন্তু সীমান্তের এ হত্যাকা-ে বিএসএফ-এর যুক্তি কতটা বাস্তব সম্মত। সেদিন দুজনের হত্যা কী প্রমাণ করে। তারাতো রাতে নিহত হননি তারা চোরা কারবারীও ছিলেন না। অতীতের এ নিরীহ মানুষ গুলি করে হত্যার দৃশ্য আরো করুণ বিএসএফ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে বৈঠকের প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ জুলাই পর্যন্ত ৫৯ বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর দেয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে বিএসএফ এর হাতে ৮৪৮ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে আহতের সংখ্যা ১০০০ এর মত। এছাড়াও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে, অনেক বাংলাদেশী ধরে নিয়ে গেছে যাদের কোম হদিস মেলেনি।বিএসএফ-এর গুলিতে ২০০৮ এ মোট নিহত হয়েছে ৬২ জন। জানুয়ারি ২০০৮ থেকে ১০ জুলাই, বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকের প্রথম দিন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১২১ জন। ২০০৭ এ নিহত হয়েছে ১২০ জন। ২০০৬ এ ১৪৬ জন ২০০৫ এ ১০৪ জন। ২০০৪ এ ৭৬ জন। ২০০৩ এ ৪৩ জন। ২০০২ এ ১০৫ জন ২০০১ এ ৯৪ জন এবং ২০০০ সালে ৩৯ জন নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত হয়েছে।এ ১০ বছরে বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকের সংখ্যাও কম ছিলো না। বিডিআর-বিএসএফ সমঝোতাও হয়েছে অনেক বার। কিন্তু বেপরোয়া বিএসএফ, কোন চুক্তি, সমঝোতা কিংবা অলোচনাকে আমলে নেয়নি তারা।বাস্তবে দেখা গেছে সীমান্তে গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন অধিকাংশই কৃষক। যারা কৃষি কাজ করে জীবন ধারণ করেন। এছাড়াও নিহতদের মধ্যে রয়েছে জেলে, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, রাখাল, নারী এমনকি শিশুও। ভারত বলেছে তাদের সীমানায় তারা অপরাধীদের হত্যা করেছে, অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এরা অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ সীমানায়। ৪১৪৪ কিলোমিটার সীমান্ত-এর মধ্যেই এত হত্যা। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে বিএসএফ-এর গুলিতে বেশি নিহত এলাকাগুলো হলো- সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম।এসব এলাকার সীমান্তবর্তী মানুষ খুবই গরিব। অধিকাংশই কৃষি কাজ করে খায়। এছাড়াও মাছ ধরে কিংবা কোন মতে জীবন ধারণ করে। এ অসহায় মানুষগুলো সবসময়ই বিএসএফ-এর গুলির ভয়ে তটস্থ থাকেন ।বিএসএফ-এর এ বেপরোয়া ভাবের কথা খোদ ভারতেও শোনা যাচ্ছিল। ভারতের মোচা নামক একটি মানবাধিকারণ সংগঠন তাদের এক জরিপে বলেছে, ২০০৮-এর জানুয়ারি থেকে ১৩ জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত এ ১৯ মাসে বিএসএফ-এর হাতে ভারতেরই ১৮ জন নাগরিক মারা গেছে।বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা সম্পর্কে বিএসএফের বক্তব্য গুলিতে নিহত হওয়া ৮৫ ভাগই অপরাধী। তাদের এ বক্তব্য যদি সঠিকও হয়, অপরাধী হলেই কী তাদের দেখা মাত্রই গুলি করতে হবে? গুলি করে হত্যাই কী সমাধান? এ ছাড়া বুঝি কোন পথ নেই। দেখা মাত্রই গুলির প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিৎ চোরাকারবারী, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, নারী-শিশু পাচারকারীদের মতো অপরাধীদের বিরুদ্ধে সীমান্তে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেটা যে দেখলেই সাথে সাথে গুলি, তা নয়। গুলির এ প্রবণতার ফলে নিরীহ মানুষ বিনা অপরাধে মারা পড়ছে। আবার সীমান্তে অনেক সময় সীমানা চিহ্নের খুটি দেখা যায় না, ভুলে কেউ ওপারে গেলেই গুলি চালায় বিএসএফ।বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকে অবশ্য এ নিরীহ নাগরিক হত্যার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিলো। বিএসএফের মহাপরিচালক মাহেন্দ্র লাল কুমাওয়াত এ হত্যা বন্ধের অঙ্গীকার করেছেন। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে পাকিস্তান-ভারত সীমান্তের মত যৌথ টহলের ব্যবস্থা করলে হয়তো এ হত্যা বন্ধ হতে পারে।ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশী বললেও পরিচয়টা খাটো হয়ে যায়। ভারত গোটা বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ সেভাবে লক্ষ্যণীয় নয়।বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে অনেক অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত করা এখনো বাকি রয়েছে। আমাদের তালপট্টি দ্বীপ রয়েছে ভারতের দখলে। ছিটমহর সমস্যা জিইয়ে রেখেছে ভারত আমাদের উপকূলীয় গ্যাস-তেল ক্ষেত্রগুলোকে আন্তর্জাতিক লিজ দেয়ায় বাধা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক ফোরামে এগুলোর মালিকানা দাবী করে বসেছে। একবার ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের একাংশকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশে অন্য একটি বিস্তীর্ন অঞ্চল বিপর্যস্ত করে তোলার পথে। ভারতের সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও অন্তত নিরীহ মানুষ হত্যার বিষয়টির জরুরি সমাধান হওয়া দরকার। সীমান্তে বারবারই জিরো টলারেন্স নীতির কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে ফলে না। আমাদের নিরীহ বাংলাদেশীদের গুলি করে, পিটিয়ে এমনকি বিদ্যুতের শক দিয়ে মারছে। এগুলো কখনোই মেনে নেয়ার মতো নয়। পাশাপাশি দুই দেশের উন্নয়নে বন্ধুত্ব জরুরি। এর জন্য আলোচনার বিকল্প নেই। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশী সুলভ আচরণই চাই। এটা সত্যিকারই দুঃখজনক এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের নিরীহ লোকগুলো প্রাণ হারাবে। এ বিষয়ে সমঝোতা বৈঠক হলেও বাস্তবে ফলবে না।বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক অনেক ভালো বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ভালো সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এ বিষয়টির ফয়সালা করা সময়ের দাবী। সরকার নিশ্চয়ই চাইবেন না আমাদের নাগরিকরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে এভাবে মারা পড়–ক। দেশের স্বার্থে, নাগরিকের কল্যাণে এ ব্যপারে সরকারের কিছু করা আবশ্যক। সীমান্তের সাথে জড়িত তাদের কর্র্র্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রের উচ্চ মহলে আলোচনা বা যেভাবে সম্ভব একটা সমাধান সবাই চায়।আমাদের বিশ্বাস বিএসএফকে তাদের খুনি আচরণ বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগ কাজে দিবে। নিরীহ কোন বাঙ্গালী আর এভাবে বিনা বিচরে মারা যাবে না। য়

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৫, ২০১০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কত আবু বকরকে হারাবে ( দিনক েডসিটিন ১২ েফব্রুয়াির ২০১০)





ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কত আবু বকরকে হারাবে
মাহফুজুর রহমান মানিক
এসএসসিতে বি গ্রেড পেলেও এইচএসসিতে এ+। প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম সেমিস্টারেই তার বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয়। এতেই সে তৃপ্ত হতে পারেনি। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হতে প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। বর্গাচাষী পরিবার অতি কষ্টে লেখা-পড়ার খরচ চালান। পরিবারের কষ্ট দেখে ছোট ভাইকে প্রবোধ দিয়েছে, আর একটা বছর তোমরা কষ্ট কর। এরপর আমি পাশ করে বের হবো। ভালো চাকরি হবে। তোমাদের আর কষ্ট করতে হবে না। আবু বকরের এ স্বপ্ন চির অধরাই থেকে গেল। মা বলেছে বাবা বাড়ি আয়, ছেলে তার টার্গেটে অবিচল। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম তাকে হতে হবে। মাকে বলেছে, ৫ম সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ করেই বাড়ি আসব। অনেক দিন থাকব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক। পরীক্ষার আগেই ফিরে গেছে মায়ের কোলে। আবু বকর হিসেবে নয়, লাশ হয়ে। এখন আর লাইব্রেরিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না তাকে। পাওয়া যাবে না সেমিনারে কিংবা ক্লাসে। সুন্দর হাতের লেখা নোট খাতা আর কেউ পাবে না। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে নোট খাতা। আবু বকর পাড়ি জমিয়েছে পরোপারে। আর কোন দিন ফিরে আসবে না। ছাত্ররাজনীতির বলি হয়ে প্রাণ দিয়েছে। নির্মম বাস্তবতা হলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে জীবন দিয়েছে। আবু বকর সিদ্দিক। কত স্বপ্ন ছিল তার। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী। টানাপোড়নের সংসারে মা তিন বছর ধরে মাথায় নারিকেল তেল দেন না, যদি এ তেলের টাকা বাঁচিয়ে আবু বকরকে দেয়া যায়। ছেলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে, অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করবে। আবু বকর ছিলেন একটি ফুটন্ত গোলাপ। সদা হাস্যময়ী, অত্যন্ত বিনয়ী। আচরণের দিক দিয়ে যার জুড়ি মেলা ভার। মানুষ হিসেবে পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী এ আনুষটি সারাক্ষণ পড়াশুনা আর ভালো রেজাল্টের চিন্তায় ছিল মশগুল। একসময় টিউশনি করলে ও রেজাল্টের কথা ভেবে টিউশনি ছেড়ে দেন। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতো, যেটা তার সহপাঠীদের প্রশ্ন শিক্ষক হতে চেয়ে আবু বকর লাশ কেন? এ উত্তর কে দেবে।? একজন সম্পাদক অবশ্য উত্তর চেয়েছেন এভাবে যে প্রধানমন্ত্রী, বকরের মা বাবাকে কি বলবেন? এ প্রসঙ্গে পরে আসছি। আবু বকরের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর ইন্টারনেটে বসছিলাম। ইমেইল চেক করছি, একজন ইমেইল করেছে নিরীহ একটা শিক্ষার্থী মারা গেলো, তার জন্য কিছুই করতে পারলেন না? সেদিন বুধবার ৩ ফেব্রুয়ারি, বকর মারা গেছে সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিটে, পত্রিকায় এখনো সে সংবাদ আসনি। ইন্টারনেট ভিত্তিক সংবাদ সংস্থার কেউ কেউ এ সংবাদ দিয়েছে। মৃত্যুর সংবাদে তার বিভাগের শিক্ষার্থীরা মিছিল করতে চেয়েছে, ভাংচুর করেছে প্রক্টরের রুম ও কয়েকটা গাড়ি। ৩ তারিখ গেলো, পরদিন সকালেই পত্রিকার সংবাদ, প্রায় প্রত্যেকটা পত্রিকা শিরোনাম করেছে আবু বকরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, কেউ লিখেছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যু কলংক’ কেউ বলেছে, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল’ আবার কারো শিরোনাম ‘ছাত্রলীগের কোন্দলে ঢাবি রক্তাক্ত’। মূল ঘটনা ১ ফেব্রুয়ারির, রাত ১টার পর ছাত্রলীগের স্যার এ এফ রহমান হলের দু’গ্রুপের সংঘর্ষের জেরে আহত হয়ে রাত তিনটার পর হাসপাতালে যান আবু বকর। একদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৩ তারিখ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আবু বকরের মা তখনো জানতেন না তার ছেলে আর নেই। ভাবেননি বকরের মুখ থেকে মা ডাকটা আর কখনো শুনবেন না। বিকেলে ছেলের লাশ দেখে মা বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। যে ছেলেকে পড়ানোর জন্য মা এতো কষ্ট করেছেন, সে কিনা আজ তার আগেই চলে গেলো, মা বিলাপ করছিলো, তোমরা আমার আবু বকরকে ফিরিয়ে দাও। আবু বকরের বাবা কিছুদিন আগেও ধার করে তার জন্য এক হাজার টাকা পাঠিয়েছে। সে টাকা পরিশোধের আগেই হাজির ছেলের লাশ। তার বড় ভাই। পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে ভাইকে টিউশনি করতে দেয়নি, নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে টাকা দিতো। আর ছোট ভাই যে গুনছে কবে এক বছর শেষ হবে। ভাই চাকরি করবে, অভাব থাকবে না। গোটা পরিবারের এ স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে।আবু বকর কতোটা সংগ্রামী জীবন যাপন করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ব্যস্ততায় ছুটি পেয়ে যখন বাড়ি যেতো, অন্যান্যদের মতো তার আনন্দ করার, আড্ডা দেয়ার, বিশ্রাম করার সময় কোথায়? পড়াশোনার খরচের চিন্তায় সে মাঠে কাজ করতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও কৃষকের মতো কাজ করতে তার মনে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। তার এলাকায় সেই একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাকে নিয়ে সবাই গর্ব করতো। তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই কী তার অপরাধ? তার সাথীরা মানববন্ধন করছে, তারা লিখেছে, ‘আমাকে গুলি কর’ ’আমি অনিরাপদ’, এই পড়াশোনা আমাকে খুন করতে শেখায়’ তারা প্রশ্ন করেছে, আবু বকর মরলো কেন? এ দায় কার? এ কোন বর্বরতা?আগের একটা প্রসঙ্গে ফিরছি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন একজন সম্পাদক, প্রধানমন্ত্রী, আবু বকরের মা-বাবাকে কী বলবেন? উত্তরটা কী আমাদের মাননীয় স্বরাস্ট্র মন্ত্রী দিয়েছেন? ‘তেমন কিছুই ঘটেনি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। যদি তাই হয় তাহলে জাতি হতাশ। একজন দায়িত্বশীলের মুখ থেকে কেউ এমন বক্তব্য আশা করে না। যেখানে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সৃষ্ট তা-বে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পড়াশোনার অবস্থা যায় যায়, ভর্তি বাণিজ্য চলছে কলেজগুলোতে, শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারা যাচ্ছে। এরপরও সব স্বাভাবিক আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।গেলো বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষে ছাত্র মারা গেলেও বা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো স্বাভাবিক। এখানে ছোটখাটো সংঘর্ষ হলেও বিশ্ববিদ্যালয় একদিনের জন্যও বন্ধ ছিলো না, কোন শিক্ষার্থীকে প্রাণও দিতে হয়নি, কিন্তু এ বছরের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুঃসংবাদ। আঠারো জানুয়ারি ছাত্রদলের কোন্দলে রক্তাক্ত হয় ক্যাম্পাস, ধর্মঘটে দু’দিন বন্ধ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর আবু বকরের মতো মেধাবী ছাত্র হারালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণটা ছাত্ররাজনীতিই।এখন ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের মাস, এ মাসেই ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করেছেন, আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। তখন ছাত্রদের আন্দোলন বা ছাত্ররাজনীতি ছিলো দেশ ও মানবতার জন্য। আর এখন ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতার জন্য। আগে ছাত্ররা শহীদ হয়েছে দেশের জন্য, এখন প্রাণ হারাচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। তখন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে পড়াশোনাও করেছে, এখন পড়াশোন তো দূরে থাক পড়াশোনার পরিবেশই বিঘিœত করছে। নেতারা বছর বছর ইয়ার গ্যাপ দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখছে, আর কর্মীরা ক্লাস বাদ দিয়ে করছে প্রোগ্রাম। সিটের দৌঁড়ে ক্লাস আর পরীক্ষা অনেক পেছনে। শিক্ষকরাও করছেন রাজনীতি। দিন দিন অবনতি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান। প্রতিযোগিতার বিশ্বে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পিছিয়ে পড়ছি আমরা।৩ ফেব্রুয়ারি, যেদিন আবু বকর মারা যায়, দৈনিক ডেসটিনি পত্রিকার সম্পাদকীয় ছিলো ‘ঢাবি আবার ঐতিহ্য ফিরে পাক এ প্রত্যাশা কেন নয়’। যথার্থ সম্পাদকীয়। এ প্রত্যাশা আমাদের থাকবেই। কিন্তু যেখানে আবু বকরের মত শিক্ষার্থী প্রাণ হারান আমরা একটু হলেও মুষড়ে পড়ি। তবে ভেঙ্গে না পড়ে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার রসদ পাই। এজন্যই পশ্চিমা দেশগুলো নাকি চায় আমরা যেন ইতিহাস চর্চা না করি। তারা চায় আমরা বিশ্বায়নে ডুবে থেকে তাদের অনুসরন করি। কারণ আমাদের অতীত ঐতিহ্য আমাদেরকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য বেশি আন্দোলিত করে।সম্পাদকীয়টি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং ধরে হিসেব করেছে, র‌্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের অবস্থান ৫৭১ তম। ২০০৮ সালে ছিলো ৫২৮তম। ২০০৭ সালে ৫২৭তম এবং ২০০৬ সালে ছিলো ৩৬৫তম। এভাবে দিনদিন এর মান নিম্নগামী হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সময় বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। তখন পড়াশোনার মান, গবেষণা এবং সকল শিক্ষার্থীদেরকে আবাসন সুবিধা দেয়ার দেয়ার দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ডের সমকক্ষ ছিলো, ফলে নাম হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। বিভিন্ন দেশ হতে শিক্ষার্থীরা এসে এখানে পড়াশোনা করতো। বিশ্বব্যাপী এর মান ও ছিলো সমাদৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সে মানকে ধরে রাখতে পারেনি। আজ থেকে দশ বছর আগেও ১৯৯৯ সালে এশিয়া উইকের রেটিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিলো ৩৭, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী ছিলো সমাদৃত।এগুলো এখন ইতিহাস। ইতিহাসকে ভর করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যখন আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, তখনি তাজা প্রাণ আবু বকরকে আমরা হারিয়েছি। আবার দেখছি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট, ছাত্র সংঘর্ষ। তাহলে আমরা বিশ্বের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালযের সাথে কীভাবে প্রতিযোগিতা করবো। কোন বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে ছাত্ররাজনীতির কারণে পড়াশোনা নষ্ট হয়? ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ছাত্র নিহত হয়? আবশ্য আমরা কয়েক বছর আগে আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন গুলি করে কয়েকজন হত্যা করেছে সে সংবাদ শুনেছি। কিন্তু সে ঘটনা আর আমাদের আবু বকরের মৃত্যুর ঘটনা এক নয়। মৃত্যুর মিছিলের সূচনাটা আবু বকর নয়। সে মিছিলের একজন সদস্য মাত্র। এভাবে গত ষাট বছরে শতাধিক হত্যাকা- ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোন হত্যাকা-েরই রহস্য উদঘাটিত হয়নি। বিচার তো দূরের কথা। মৃত্যুর এ মিছিলে আর কত আবু বকরকে শরীক হতে হবে আমরা জানি না। আমরা জানি না খুনিদের আদৌ বিচার হবে কিনা। জানিনা আবু বকরের মায়ের মতো কত মায়ের বুক খালি হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়ে লাশ হবে। আবু বকরের মাকে প্রবোধ দেয়ার মতো কোন ভাষা আমাদের নেই। তবে এটাতো ঠিক আবু বকর একজন নিরীহ ছাত্র, যে প্রাণ দিয়েছে ছাত্র রাজনীতির বলি হয়ে।যারা ছাত্ররাজনীতি পুষছেন, ছাত্র রাজনীতির নামে দলবাজী করাচ্ছেন, তাদের জন্য কী কোন শিক্ষনীয় বিষয নেই? আবু বকর যদি তাদের সšতান হতেন, অনুভুতি কেমন হতো। মৃত্যুর এ মিছিল দীর্ঘ হোক এটা কেও চায়না। সময় এসেছে ভাবার, বড় রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদেরকে তাদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করবেন না। ছাত্র রাজনীতির সাথে দেশের রাজনীতির কোন সংশ্রব থাকবে না। কোন দল ক্ষমতায় আসলো কী না আসলো এতে ছাত্রদের কিছু আসে যায়না। হলগুলো ক্ষমতায় যারা আছে তাদের এমন কোন কথা থাকবে না। ছাত্ররা শুধু পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করার আন্দোলন করবে। তবেই আমাদের ছাত্ররাজনীতির সমাধান। অন্যথায় ধমকিয়ে, সাময়িক কমিটি বাতিল করে, কিংবা সাংবিধানিক পদ থেকে পদত্যাগ করে আদৌ সমাধান হবে না।আবু বকরের মৃত্যু সে পথে পরিচালিত করতে আমাদের মনে একটু নাড়া দেবে কী?আবু বকর সিদ্দিক মারা গেছে, তার খুনিদের বিচার করতে হবে। সঠিক তদন্ত করে তা প্রকাশ করা চাই। বকরের পরিবারকে সহযোগিতা করার যে ঘোষণা হয়েছে তা কিছুই না, তবুও সেটুকুও যেন দ্রুত দিয়ে দেয়া হয়। আবু বকরের এ এফ রহমান হলের সহপাঠীরা তার মৃত্যুতে হলের সামনে একটা ব্যানার টানিয়েছে, সে ব্যানারের শুরুটা যে কবিতাংশ দিয়ে তা উল্লেখ করে শেষ করছি- চলে গেলে তুমি কোন সুদূরেস্মৃতিগুলো রয়ে গেছে হৃদয় জুড়েদেখা কী আর হবে তোমার?নিরুত্তর প্রকৃতি শুধুই হাহাকার

জলবায়ুর পরিবর্তন আমাদের করণীয় ( দিনক যায়যায়িদন ০৬ িডেসম্বর ২০০৯)


http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=164058

জলবায়ুর পরিবর্তন আমাদের করণীয়
মাহফুজুর রহমান মানিক
উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী। পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। পৃথিবীর এ উষ্ণতার প্রধান কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন। কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, সিএফসি-১২ প্রভৃতির গ্যাস অধিক পরিমাণে নির্গমনের ফলেই বাড়ছে এ উষ্ণতা। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। গরম হচ্ছে সমুদ্রের পানি। এক্ষেত্রে ইন্টার গভর্নরমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেন্ট চেঞ্জ তথা আইপিসিসির প্রতিবেদন প্রতিধানযোগ্য। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে আইপিসিসির তিনটি ওয়ার: M‡elK্কিং গ্রুপ তাদের প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত সার প্রকাশ করেছে। ওয়ার্কিং গ্রুপ-১ এর পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১৭৫০ এরপর থেকে মানুষের নানাবিধ কর্মকা-ের ফলে বায়ুম-লে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রো অক্সাইডসহ বহু তাপ শোষণকারী গ্যাসের ঘনত্ব ক্রমে বেড়েছে। ফলে ২০২০ দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়বে ০.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওয়ার্কিং গ্রুপ-২ বলছে, উষ্ণতা বৃদ্ধির যে হার ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে তা বিশ্বকে নিয়ে চলেছে ভয়াবহ পরিণতির দিকে। আইপিসিসি আরো জানিয়েছে, ১৭৫০ সালের আগের সাড়ে ছয় লাখ বছরে বায়ুম-লে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ১৮০ থেকে ৩০০ পিপিএম, ২০০৫ সালে তা হয়েছে ৩৭৯ পিপিএম, মিথেন ছিল ৩২০ থেকে ৭৯০ পিপিবি, ২০০৫ সালে তা হয়েছে ১৭৭৪ পিপিবি, নাইট্রাস অক্সাইড ছিল ২৭০ পিপিবি, ২০০৫ এ হয়েছে ২১৯ পিপিবি (পার পার্টস বিলিয়ন)। ফলে এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে যা হবে তা হলো-গড় তাপ, তাপদাহ ও তীব্র বৃষ্টিপাত বাড়বে অধিক হারে। খরা টাইফুন ও হ্যারিকেনসহ মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা এবং উঁচু জোয়ারের প্রচ-তা বাড়বে তীব্রভাবে। আর্কটিক ও এন্টার্কটিকার বরফ দ্রুত কমে আসবে ও গ্রীষ্মকালে তা বিলোপ পাবে। এর জন্য দায়ী কারা? দায়ী উন্নত বিশ্ব। বিশ্বব্যাংক ক্লাইমেট ডাটাবেজ ২০০৪ থেকে জানা যায়, ২০০২ সালে একজন আমেরিকান গড়ে ২০ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন করেছে। অস্ট্র্রেলিয়ায় এর পরিমাণ ১৬ টন, যুক্তরাজ্যে ৯ টন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮ টন। উন্নত বিশ্বের বিলাসিতা আর শিল্পায়নই এর জন্য দায়ী। ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত কার্বন গ্যাস নির্গমনে বিভিন্ন দেশের দায়ভার এবং জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচিতে তাদের অবস্থানের ভিত্তিতে ধনী দেশের ব্যয় সক্ষমতার মাত্রা নির্ধারণ করে অক্সফাম দাবি করেছে যে, গরিব দেশগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন ব্যয়ের শতকরা ৪৪ ভাগ বহন করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, শতকরা ১৩ ভাগ বহন করতে হবে জাপানকে, ৭ ভাগের কিছু বেশি বহন করতে হবে জার্মানিকে, ৫ ভাগের কিছু বেশি বহন করতে হবে যুক্তরাজ্যকে, শতকরা ৪-৫ ভাগের কিছু বেশি বহন করতে হবে ইতালি, ফ্রান্স ও কানাডাকে এবং শতকরা ৩ ভাগ বহন করতে হবে স্পেন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে। উন্নয়নশীল এ বিশ্ব শিল্পায়নের নামে অধিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে নিজেরা উন্নত হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি করেছে উন্নয়নশীল এবং দারিদ্র্য বিশ্বকে। উন্নয়নশীল বিশ্ব আজ মারাত্মক ক্ষতিতে রয়েছে। যার প্রকৃষ্ট মডেল বাংলাদেশ। তাই এ জলবায়ুর পরিবর্তনের যেমন দায়ী উন্নত বিশ্ব ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় সব দায় উন্নত বিশ্বের ঘাড়েই। কোনো প্রকার অপরাধ না করেই উন্নয়নশীল বিশ্ব যে ক্ষতির শিকার হয়েছে তার মোকাবেলায় উন্নত বিশ্বের দুটি প্রধান দায়িত্ব। প্রথমটি হচ্ছে যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে তার ক্ষতি পূরণ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধকরণ। তাই এখানে ন্যায্যতার প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তনে যাদের কোনো ভূমিকা নেই সেসব ক্ষতিগ্রস্ত দেশের জনগণের প্রতি ন্যায়বিচারের স্বার্থে উন্নত দেশগুলোরই উচিত প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা। কিন্তু এ ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের আচরণ খুবই দুঃখজনক। ইউএনএফসিসির চুক্তিমতে আমরা তিন ধরনের দেশপাই ঘী১ ভুক্ত দেশ। যারা উন্নত। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ দায়ী। তাদের কাজ হলো ক্ষতিপূরণ দেয়া। ঘী২ ভুক্ত দেশ যারা উন্নত কিন্তু খুব বেশি দায়ী নয় এরাও পরোক্ষভাবে দায়ী। ক্ষতিপূরণ দেয়ার দলেই। আর শেষ হলো ঘী৩ ভুক্ত দেশ। যারা ভুক্তভোগী তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে। যেমন বাংলাদেশ। টঘঋঈঈ স্বাক্ষরিত দেশগুলোর বৈঠক অর্থাৎ ঈড়ঢ় এর বৈঠকের মাধ্যমে এগুলো স্বীকৃত। এ ব্যাপারে ঈড়ঢ় আর্টিকেল ৮-এর ৯-এ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এসবই ছিল চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সবচেয়ে দায়ী আমেরিকাসহ অন্য উন্নত দেশগুলোর অনেকে বের হয়ে গেছে কিয়োটো প্রটোকল থেকে, ফলে অকার্যকর হয়ে গেছে এ চুক্তি। উন্নত বিশ্বের আগের আচরণ ছিল বৈষম্যমূলক। যেখানে তারা জলবায়ুর পরিবর্তনে দায়ী করছিল উন্নয়নশীল বিশ্বকেই। বলেছেÑ তোমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এর জন্যই এ জলবায়ুর পরিবর্তন। সবচেয়ে চমকপ্রদ এক তথ্য দিয়েছেন আল গোর। তার বইয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ দায় এড়াতে যে গোপন কৌশল করেছে তা ফাঁস করেছেন। বইয়ের ৪২ নং পৃষ্ঠার (বাংলা অনুবাদ) কিয়দংশ হুবহু তুলে ধরছি- ‘১৯৯০ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রাক্কালে বুশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হোয়াইট হাউস নীতিবিষয়ক মুখপাত্র কর্মকর্তাদের কাছে একটা গোপন স্মারক পাঠায়। যাতে আভাস দিয়ে বলা হয় যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে কার্য ব্যবস্থায় জনগণকে তাদের সমর্থন না দেয়ার ব্যাপারে বোঝানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে। এ ধরনের সমস্যার আদৌ অস্তিত্ব নেই এ কথা সরাসরি না বলে এ ব্যাপারে অনেক অনিশ্চিত বিষয় রয়েছে এ রকম বক্তব্য তুলে ধরা। বলা বাহুল্য, হোয়াইট হাউজের এ স্মারকটি সংবাদপত্রে ফাঁস হয়ে যায়। কাজেই হোয়াইট হাউজ দিয়ে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মোকাবেলা যে প্রতিশ্রুতি বুশ করেছিলেন তার স্বরূপ এরকমই।’অবশ্য আজকের ধনী দেশগুলোর টনক নড়েছে। মার্কিন প্রশাসনেও বারাক ওবামার নেতৃত্ব বিশ্ববাসীর পক্ষেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের ন্যায্যতা আদায়ে সোচ্চার। মালদ্বীপ যেমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তেমনি বাংলাদেশের ভূমিকাও কম নয়। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের বক্তব্যে ভূয়সী প্রশংসা করেছে বারাক ওবামাসহ বিশ্ব নেতারা। আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন এগিয়ে আসছে সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতারাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। জলবায়ুর পরিবর্তনে সবার দায়িত্ব পালনে সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দৃষ্টি এখন ডিসেম্বরের কোপেনহেগেন। জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় দায় দিতে প্রস্তুত উন্নত বিশ্ব। তার ফলে বলা চলে গোটা বিশ্ব এ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ। তাই সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে ‘আমরাই পারি’ শিরোনামে লিখেছেন ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সারাবিশ্বের নেতাদের যুক্ততা ও নেতৃত্ব দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শতাধিক দেশের জলবায়ুর পরিবর্তন সম্মেলনে যোগ দেন। তার এ অংশগ্রহণ সংহতি ও দায়বদ্ধতা স্পষ্ট বার্তাবাহী। একইভাবে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতারা দূষণমুক্ত জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নতি ঘটানো ও কোপেহেগেন সম্মেলন সফল হওয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নরওয়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নির্গমন কমাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। বন ধ্বংসের ফলে যে নির্গমন তা প্রচুর পরিমাণে কমানোর পরিকল্পনা হাজির করেছে ব্রাজিল । নির্গমন কমাতে ভারতও নানা কার্যক্রম নিচ্ছে। বান কি মুন তার নিবন্ধে আরো উল্লেখ করেছে- ধীরে ধীরে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোপেনহেগেন সম্মেলনের কাছাকাছি চলে এসেছি। আর সে সম্মেলনের সফলতার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। সম্প্রতি লন্ডনে অথনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী ১৭টি দেশের (যারা বিশ্বের ৮০ ভাগ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী) এর সভায় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন জানিয়েছেন, দেশগুলো এতে সম্পৃক্ত হয়ে পরিবর্তনের কোনো সমন্বিত এজেন্ডা তুলে ধরলে কোপেনহেগেন সম্মেলনের সফলতা দূরবর্তী কোনো জিনিস হবে না।’উন্নত বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তাদের দায় দিতে প্রস্তুত। সেটি যতো উপায়ে সম্ভব তা করবে। এর পাশাপাশি আমাদেরও অনেক করণীয় রয়েছে। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ জলবায়ুর অভিঘাতে বিপর্যস্ত। আমাদের প্রাণের দেশকে রক্ষা করতে হবে আমাদেরই। জলবায়ুর পরিবর্তনে আমরা কোনোভাবেই দায়ী নই। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের তালিকায় আমাদের অবস্থান বিশ্ব র‌্যাকিংয়ে ১৮২তম। অথচ যে গ্রিনহাউসের নির্গমনের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, বিশ্ব উষ্ণতা বাড়ছে তার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মডেল বাংলাদেশ। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্তদের বিশ্ব র‌্যাকিংয়ের চ্যাম্পিয়নশিপটি বাংলাদেশের হাতে। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ডিজাস্টার রিডাকশনের মতে খাদ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্থান প্রথম। আবার ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সের (জলবায়ু ঝুঁকিসূচক) তালিকায় প্রথম নামটি বাংলাদেশের। বাস্তবতাও তাই বলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগÑ বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় তারই লক্ষণ মাত্র। ২০০৭-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর। এরপর বন্যা, আবার আইলা ইত্যাদিতে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লাইমেট চেঞ্জ সেলের তথ্য মতে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৯৩টি বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে, ফলে প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে ক্ষতি হয়েছে ৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্ষার সময় বৃষ্টি না হওয়া, সমুদ্রে ঘনঘন বিপদ সঙ্কেত এসবই জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলেই হচ্ছে। এসব দুর্যোগ যেমন জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে হচ্ছে পাশাপাশি আরো কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে আমাদের অবস্থানই এ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর উত্তরে হিমালয়। আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব আর জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি জলবায়ুর পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। আমাদের সামাজিক অবস্থান আর অর্থনৈতিক অবস্থাও এর জন্য কম দায়ী নয়। এসব অবস্থা বিদ্যামান থাকতে জলবায়ুর পরিবর্তন বর্তমানের মতো এতো দ্রুত হতে থাকলে আমাদের অস্তিত্ব বাঁচানোই দায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং ৪৫ সেন্টিমিটার বা তার বেশি সমুদ্র স্ফীতির মুখোমুখি হতে পারে। ফলে স্থায়ীভাবে প্লাবিত হতে যাওয়া ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে দেশের ব্যাপক উপকূলীয় এলাকা ও অন্যান্য নিম্নাঞ্চলে বসবাস এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ের জন্য উপযুক্ততা হারাবে। এসব এলাকার মানুষ যে শুধু আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের কবলে পড়বে তাই নয় বরং তাদের মধ্যে অসংখ্যজন উদ্বাস্তুর কাতারে যোগদান করতে বাধ্য হবে। বিধ্বংসী বন্যার প্রকোপ বাড়লে বাড়িঘর, মাঠের ফসল, ছোট ছোট শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, টেলিযোগাযোগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুনর্বাসন ব্যবস্থাও ব্যাহত হবে। বন্যার ফলে দেখা দেবে নানা রোগ। দরিদ্র হবে হতদরিদ্র। জলবায়ুর পরিবর্তনে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। কৃষি ফসলের জমি কমবে, সমুদ্রে পানির উচ্চতা বেড়ে তলিয়ে যেতে পারে আমাদের স্বদেশ। জলবায়ুর পরিবর্তনে বাংলাদেশের প্রধান প্রভাব পড়বে পানি সম্পদ, উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি, স্বাস্থ্য, জীবনধারা, খাদ্য, বাসস্থানের ওপর। আমরা যখন এসব হতাশাচ্ছন্ন প্রতিবেদন দেখছি পাশাপাশি আমাদের আশার আলোও আছে। আশার আলোর প্রদীপটিকে প্রজ্বলিত করতে সেটি চারদিকে আলোকিত করতে আমাদের করণীয় অনেক। করণীয়র পথে আমরা ইতিমধ্যে হাঁটতে শুরু করেছি। এ পথের বাকি আরো অনেক। প্রথমত, জলবায়ুর পরিবর্তনে আমরা যে দায়ী নই আর যারা দায়ী তাদের কাছে আমাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সাহসের সঙ্গেই তুলে ধরতে পেরেছি। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আমাদের সরকারের সে তৎপরতায় বিশ্ব বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। আমাদের এ ক্ষতির মোকাবেলা সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যে গবেষণা প্রয়োজন তার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক্লাইমেট চেঞ্জ সেল। আর সবচেয়ে বড় বিষয়টি অ্যাডাপটেশন তথা অভিযোজন। এর জন্য যে অর্থায়ন প্রয়োজন তার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। ২০০৭-এর বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়ের পর সে বছরের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত জলবায়ুর পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশ্বের মনযোগ আকর্ষণ করে এবং ধনী দেশের সহযোগিতার দাবিতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য সরকারের আগ্রহে ২০০৮ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ইউকে কনফারেন্স অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ আবারো উন্নত বিশ্বের প্রতি জোরালোভাবে আহ্বান জানায় গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর জন্য এবং বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজনের ব্যয় বহনের জন্য। সে দিন বিশ্বব্যাংক, এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক বাংলাদেশকে সহযোগিতার দৃঢ় আশ্বাস দেন। ডাচ রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা নিশ্চয়তা দিতে চাই যে, বাংলাদেশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে না। সে দিন সবাই মিলে বলেন, তারা বাংলাদেশের জন্য একটি ‘মাল্টি ডোনার ট্রাস্ট ফান্ড’ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন। বাংলাদেশ ও ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ড নামে ২০০৯-এ একটি ফান্ড তৈরি করেছে। অ্যাডাপটেশনের জন্য প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সম্মেলনে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। উন্নত বিশ্ব আমাদের ক্ষতিপূরণ দিলে সেটি যাতে যথার্থ কাজে লাগানো যায় এর নিশ্চয়তার দরকার সবচেয়ে বেশি। আমাদের প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ, মেরামত, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ইত্যাদির কাজ সুন্দরভাবে করতে হবে। কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। এর সঙ্গে জড়িত একদিকে ৭০ ভাগ মানুষের পেশা কৃষি, অন্যদিকে ১০০ ভাগ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। ফলে এ খাতের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন সবার আগে। এ ছাড়াও সচেতনতা আমাদের অন্যতম করণীয়। সেটা হতে পারে কোনো ঝড়ের সময়ে শেল্টারে আশ্রয় গ্রহণ। কিংবা সাগরে মাছ ধরতে গেলে কোনো বিপদের আভাস পেলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসা, বন না কাটা। বেশি বেশি গাছ লাগানো ইত্যাদি। গ্রিনহাউস গ্যাস আমরা যতোটুকু নির্গমন করি তা জলবায়ু পরিবর্তনে তেমন কোনো ভূমিকা না রাখলেও এটি নিঃসরণ আমাদের দ্বারা যেন না হয়। কিংবা যতোটা সম্ভব কমিয়ে আনা। আমাদের ঘর-বাড়ি, টিউবওয়েল লেট্রিন ইত্যাদি অনেক উঁচু করে নির্মাণ করা। যে কোনো দুর্যোগে একদল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক সবসময় রাখা। কৃষক-শ্রমিক-চাকরিজীবী ব্যবসায়ী তথা সর্বস্তরের মানুষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরণ। সমাজের অতিদরিদ্রদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। যে কোনো উন্নয়ন কর্মকা-ে যেন জলবায়ুবিষয়ক বাড়তি ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকে। জলবায়ুর পরিবর্তনের অভিঘাত এলাকাভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সেক্ষেত্রে এটি মোকবেলায় এলাকাভিত্তিক বা সময়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি আজকের পৃথিবীতে কৃষি উন্নয়ন আর শিল্প উন্নয়নকে ছাপিয়ে আরেকটি উন্নয়নের কথা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মানব সম্পদ উন্নয়নে ঐঁসধহ জবংড়ঁৎপব ফবাবষড়ঢ়সবহঃ আমরা যদি প্রত্যেকটি নাগরিককে মানব বোঝা মানব সম্পদে পরিণত করতে পারি তবে দেশের সব সমস্যা উত্তরণ সম্ভব। আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এ মানব সম্পদ দ্বারাই সহজে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। অবশ্য দেশের তরুণ সমাজেরও এখানে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে আর আমাদের দেশে সবকিছুর আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। জলবায়ু পরির্বতন ইস্যুটি শুধু বাংলাদেশের সঙ্কটই নয় বিশ্ব সঙ্কটও বটে। বিশ্বের এ বার্নিং ইস্যুর মোকাবেলায় উন্নত বিশ্বই যথেষ্ট। আমরাও আমাদের করণীয় পালন করবো। আশা করছি কোপেনহেগেন ডিসেম্বরের (৭-১৮) সেদিনের জন্যই অপেক্ষা করছে যেদিন উন্নত বিশ্ব বলবে আমাদের প্রাণের এ পৃথিবীকে আমরা ধ্বংস করবো না। বাসযোগ্য পৃথিবীতে সবাই শান্তিতেই বাস করবে। আমাদের অপরাধের কারণে নিরীহ মানুষদের শাস্তি দেবো না। স্বপ্নের পৃথিবীর সত্যিকার রূপেই বাস্তবে ধরা দেবে। আর বাংলাদেশ বলবে আমরা এটাই চেয়েছি, আমাদের সবুজ-শ্যামল দেশটির সবুজ ধরে রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞ।

মাহফুজুর রহমান মানিক:

বুধবার, মার্চ ২৪, ২০১০

ছাত্র রাজনীতি না দলবাজী? (ৈদিনক েডসিটিন ২৭ জানুয়াির ২০১০)


ছাত্র রাজনীতি না দলবাজী?
মাহফুজুর রহমান মানিক
অনেকে বলেন ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমি একমত নই। আমি মনে করি ছাত্র রাজনীতি চালু করতে হবে। ছাত্ররা এখন যে রাজনীতি করছে এটাকে হয়তো সবাই ছাত্র রাজনীতি বলবেন। এটা কীভাবে ছাত্র রাজনীতি হয়? এটা ছাত্র রাজনীতি নয়। ছাত্র রাজনীতি আমাদের দেশে বর্তমান নেই। এটা দলবাজী।১৮ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সশস্ত্র সংঘাতের কথা বলি। এটা কী কারণে হয়েছে, দলবাজীর কারণেই। বিদ্রোহী গ্রুপ পদ না পেয়ে বিদ্রোহ করেছে। দলবাজীর অন্যতম নিদর্শন হলো বিএনপি ঠিক করেছে ছাত্রদলের কমিটি। বিএনপি যাদেরকে তার দলের জন্য লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে যোগ্য মনে করেছে, তাদেরকেই কমিটিতে স্থান দিয়েছে। গত বছরের জুলাইতে প্রথম নতুন প্রথম চার সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠন করে। পরে ২০১০ এর ১ জানুয়ারিতে ১০১ জনের কমিটি গঠনের কথা থাকলেও গঠন করা হয় ১৭১ জনের কমিটি। ছাত্রদলের এ কমিটি হলেও কার্যত কেউ আত্র নন। টাকা দিয়ে, লবিং করে অনেকে কমিটিতে স্থান নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমের সংবাদ। এদের অধিকাংশই বিবাহিত। ব্যবসায়ী চাকুরীজীবিদের নিয়ে কমিটি। সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন। তার বয়স চল্লিশের ওপরে। তার স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। ছাত্রদলের এ কমিটিকে নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের ম্যাগাজিন মজা করে লিখেছে ‘আমরা শক্তি আমরা বল, বিবাহিত বৃদ্ধ দল”। এ কমিটির ওপর ছাত্রনেতৃত্ব দেয়ার অর্থ কী-দলবাজী। ছাত্রদলের কমিটি যেমন বিএনপি করেছে তদ্রুপ ছাত্রলীগের কমিটিও আওয়ামী লীগ করে থাকে।এ দলবাজীর কারণেই শিক্ষাঙ্গণে প্রতিনিয়ত হচ্ছে সংঘর্ষ। নিহত হচ্ছে শিক্ষার্থী। বন্ধ হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছাত্র রাজনীতির নামে এ দলবাজীর চিত্র নতুন নয়। এখন তো সেটা অহরহই ঘটছে। গত বছর এ ছাত্র সংঘর্ষের সংখ্য ছিলো কয়েক শ। সংঘর্ষে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিহত হয়েছে মেডিকেলের শিক্ষার্থীসহ কয়েক জন।২০১০ শুরু না হতেই সে ধারা চালু হয়ে যায়। অস্ত্রের ঝনঝনানি বেজে ওঠে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মরিয়া ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্র মৈত্রীকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা তার অনন্য নজীর। শিক্ষক লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। আর নিজেদের মাঝে গ্রুপ মারামারি তো লেগেই আছে।আজকে ছাত্ররাজনীতির নাম করে বড় বড় দলগুলো প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের লাঠিয়াল বাহিনী রাখছে। এদের নেতৃত্বে যারা আসেন তারা বড় নেতাদের অত্যন্ত স্নেহ ধন্য। এদের চলার খরচ মেটানোর ব্যবস্থাতো রয়েছেই টে-ারবাজী, চাঁদাবাজী। এগুলো ছাত্রদলবাজী।আমাদের বর্তমান এ ছাত্রদলবাজীর কারণে সরকার বদলের সাথে সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রূপও বদলে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হলগুলো হয়ে যায় সরকারী দলের। মজার বিষয় হলো বিরোধীদলের ছাত্রদলবাজী যারা করেন নিজেরাই জায়গা করে দেন সরকাররি দলকে। কারণ তারাতো জানেন সরকারি দলে থাকতে অন্যের ওপর কতোটা অত্যাচার করেছেন। আগেই হল ছেড়ে দেন। অবশ্য আগেই হল না ছাড়লে যে তাদের রক্ষা নেই সেটাও বুঝেন। সরকারি দলের ছাত্রদলবাজরাতো আরো ক্ষীপ্ত। হলে তো নয়ই ক্যাম্পাসেও যায়গা হবেনা বিরোধীদলের। ক্যাম্পাসে আসলেই মাইর। লুকিয়ে কেউ ক্লাস করলেও ক্লাস থেকে ধরে এনে হলেও তাকে উত্তম মধ্যম দিতে হবে। এভাবে ক্ষমতাসীনরা ক্যাম্পাস এবং হল থেকে অন্যদের তাড়িয়ে নিজেদের প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এতেও স্বাদ মেটে না। নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দেখা দেয় কোন্দল। একক রাজত্বে কেউ ভাগ বসাতে আসলে তার রেহাই নেই। গত বছর ঢাকা মেডিকেলের একজন মেধাবী ছাত্র এ জন্যই প্রাণ হারান। দলবাজী থাকলে এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলতেই থাকবে। কোন সুরাহা হবে না।বর্তমান এ ছাত্র দলবাজী শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণতো নয়ই বরং অকল্যাণ বললেও অত্যুক্তি হবেনা। যার কারণে শিক্ষার্থী মাতা-পিতার কাছে উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি নিয়ে সোনার মানুষ হয়ে যাওয়ার পরবর্তে যাচ্ছে লাশ হয়ে, আহত হয় শিক্ষার্থী, লাঞ্ছিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটা নিশ্চয়ই কেউ চাইবেন না।দলগুলো ঠিকই এসব থেকে আয়দা লুটছে। ছাত্রদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসছে। টে-ার, চাঁদাবাজির ভাগ পাচ্ছে অনেক নেতা। মারামারিতে লেলিয়ে দেয়ার মতো সংঘবদ্ধ শক্তি পাচ্ছে। নানা কর্মসূচিতে কাজে লাগাতে পারছে। সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের কায়েম করতে পারছে। এসব যদি পাওয়া যায় মন্দ কিসের! পড়াশোনায় গোল্লায় যায়, যাক।শিক্ষাঙ্গণে দলাদলি থাকবে না। ছাত্রদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানিক সংগঠন থাকবে। সে সংগঠনের নির্বাচন হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করবে। এখন ও অবশ্য ছাত্রদের ইউনিয়ন আছে, কিন্তু নির্বাচন নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। যেমন ডাকসু (ঢাকা ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন)। দুই দশক ধরে অচল। এভাবে প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ছাত্র ইউনিয়নগুলো কয়েক বছর ধরে অচল।ছাত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ছাত্রদের দলমুক্ত হতে হবে। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর যে ছাত্র সংগঠন আছে তা আর থাকবে না। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ থাকবে না। বিএনপির ছাত্রদল থাকবে না। জাতীয় পার্টির ছাত্র সমাজ থাকবে না। এভাবে অন্যান্য দলের কোন ছাত্র শাখা থাকবে না। ছাত্ররা নিজেদের রাজনীতি নিজেরা করবে। তখন আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মতো ছাত্ররাজনীতির সংজ্ঞা হবেÑ ছাত্রদের দ্বারা ছাত্রদের জন্য ছাত্রদের কল্যাণে পরিচালিত রাজনীতিই ছাত্ররাজনীতি।এ ছাত্র রাজনীতি চালু হলে সরকার পরিবর্তনে পরিবর্তন হবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র। হল দখল করতে কেউ আসবে না। কারো ভয়ে হল ও ত্যাগ করতে হবে না। ছাত্রদের ক্ষমতার ধান্দা থাকবে না। টে-ারবাজি আর চাঁদাবাজি করতে হবে না। পড়াশোনায় সবাই মনোযোগ দেবে। ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় অতীতের কথা প্রায়ই শুনি, পড়ি। খুঁজি। ১৯৭১ এর পর আর এগুতে পারি না। ১৯৭১ এর আগের ইতিহাসই বলা গৌরবের। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ঐক্যবদ্ধ সকল ছাত্রের দৃপ্ত শপথের ফল। এরপর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুথান এর পথ ধরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১। একাত্তরের পর স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্বে যারাই এসেছে নিজেদের স্বার্থে গঠন করেছে ছাত্র রাজনৈতিক দল। ছাত্রদেরকে সবাই নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তখন থেকেই ছাত্ররা যা করে আসছে তাকে আমরা ছাত্র রাজনীতি বলতে পারি না, সেটা দলবাজী। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে দলবাজীর সংঘর্ষ, সংঘাত, হত্যাকা-, টে-ারবাজী, চাঁদাবাজী তখনো আজকের মতো এতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেনি। নব্বইয়ের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্ররা ছিলো সোচ্চার। এরপর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলো। তখন থেকেই দলবাজীর চিত্র মানুষের সামনে ভয়ংকরভাবে উপস্থিত হয়। দেদারছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুরু হয় সংঘর্ষ। সে কলুষিত অধ্যায় যে শুরু হয়েছে দিন দিন তা বেড়ে আজ এক কঠিন রূপ ধারণ করেছে। এ বছরে এসে রাজশাহীতে হত্যাকা- এবং সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ। প্রকাশ্যে অগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। আহত হয়েছেন ছাত্রদলের সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ প্রায় ৫০ জন।বিবেকবান মানুষ মাত্রই এ ছাত্র দলবাজী বন্ধ হোক তা চান। মানুষ গড়ার আঙ্গিনায় মানুষ হওয়ার পরিবেশ চান। আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে ছাত্রসমাজকে তার মূল দায়িত্ব পালনের বিকল্প নেই। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশের নেতৃবৃন্দের। রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সমাজকে কীভাবে দেখতে চায়। তারা যদি চায় ছাত্ররা মারামারি করুক, নিহত হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হোক, পড়াশোনা গোল্লায় যাক। তো ঠিক আছে দলবাজী চলছে চলবে। দেশ যথা যায় যাক, আমার দল তো ঠিক আছে। আবার এরা যদি দেশের কল্যাণ চান। শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস দেখতে না চান। গবেষণাগারে দেখতে চান ছাত্রদের। দেশের উন্নতি চানÑ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। দলবাজী নয় ছাত্র রাজনীতি করবে ছাত্ররা। লেখাটা যখন শেষ করবো তখনি খবর পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ইনস্টিটিউট শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিটের (আইইআরের) প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন। পরীক্ষার আগের রাতে (২১.০১.২০২১) এ ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ভাগ্য ভালো কর্র্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করতে পেরেছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা কতোটা ন্যক্কারজনক ঘটনা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটাই প্রথম প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। এ ঘটনার সাথে জড়িত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের ব্যাপারে একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কী তথ্য আসে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু যা ঘটে গেলো তা কীভাবে মানা যায়। এজন্য দল ক্ষমতায় আছে বলে কোন ছাত্র যাতে যে কোন খারাপ কাজের সাহস না সেটা ও বড় বিষয়। ছাত্রদের মূল রাজনীতি এ চ্যাঞ্জেময় পৃথিবীর সময়ের দাবী রাজনীতিবিদদের এ বোধোদয় আদৌ হবে কী না জানি না।

প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণী সমাপনী পরীক্ষা য় কিছু কথা

প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণীসমাপনী পরীক্ষা য় কিছু কথা (ৈদিনক েডসিটিন ১৩ জানুয়াির ২০১০)


মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রাথমিক স্তরের সমাপনী পরীক্ষাকে অনেকে বলেছেন মিনি এসএসসি। এ পরীক্ষার পথ ধরে সরকার অষ্টম শ্রেণীতেও সমাপনী পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। যদি চালু হয় তাকে কী বলা হবে জুনিয়র এসএসসি? মূল কথা হলো, এসএসসির আদলে এসব পরীক্ষা হচ্ছে বলে এগুলোর সাথে এসএসসি কে জুড়ে দেয়ার চেষ্টা আর কি। এর আগে জাতীয় পর্যায়ে এসএসসি ছিলো প্রথম পরীক্ষা। ফলে কারো মেধার মাপকাঠি নিরূপনে প্রথমেই এসএসসির ফলাফল জানতে চাওয়া হয়। চাকরির ক্ষেত্রেও এসএসসির ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন ৫ম শ্রেণীতেই হচ্ছে জাতীয় পরীক্ষা। ফলে জীবনের একটা হিসাব নিকাশ বলা চলে এখন থেকেই শুরু হচ্ছে। এ বছর থেকে আবার যোগ হচ্ছে অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা।
জাতীয় পর্যায়ের একেকটি পরীক্ষা জীবনের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সে ধাপে আমরা আমাদের শিশুদেরকে ১০/১১ বছরেই ঠেলে দিচ্ছি। যুদ্ধ যাকে বলে। যদিও আমাদের দেশের শিশুরা ৫/৬ বছর থেকেই যুদ্ধের চ্যালেঞ্জে টিকে আসছে, নামীদামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি যুদ্ধের মাধ্যমে যার সূচনা। এটা অবশ্য রাজধানীসহ বিভাগীয় ও ভালো ভালো শহরের চিত্র। যদিও উচ্চশিক্ষায় এসব সংগ্রামে বেড়ে উঠা শিক্ষার্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। ছোটবেলা থেকেই চাপের মধ্যে থাকতে থাকতে বড় হলে এরা ঢিলা হয়ে যায়। ঘুম, বিশ্রাম, খেলাধুলার সুযোগ না দিয়ে সারাদিন পড়া আর পড়া, সাথে ৩/৪ জন হাউজ টিউটরতো আছেই। এগুলো অবশ্য শহরের চিত্র। এসবের বাইরে স্বাভাবিক পরিবেশে থেকেও গ্রামের শিশুরা ভালো করছে। যা এবারের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় প্রমাণিত হলো।
এ সমাপনী পরীক্ষা কতোটা ভালো বা খারাপ তা পরিমাপের আগে এটা যে শহর আর গ্রামের পড়াশোনার মাঝে একটা সম্পর্ক স্থাপন করেছে তা স্পষ্ট। একটা জাতীয় দৈনিকে কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে, শহরের শিশু তার বাবাকে বলছে, বাবা আমাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দাও। কেন? কারণ আমি ফার্স্ট হতে চাই। এটি কার্টুনিস্টের নিজস্ব চিন্তা হলেও বাস্তব।
গ্রামের স্কুলেও যে পড়াশোনা হয় বা এসব স্কুলে যে মেধাবী শিক্ষার্র্থীরা পড়ছে তা বুঝা গেলো। আমাদের চিন্তা অবশ্য অন্যরকম। নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে মরিয়া অভিভাবকরা ঠেলে দেন নিশ্চিত যুদ্ধে। আবার অনেকে লবিং এমনকি মোটা অংকের টাকা দিয়ে হলেও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। আমাদের এ চিন্তার পাশাপাশি নীতি নির্ধারনেও কিছু সমস্যা রয়েছে।
শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠান স্থাপনে পধঃপযসবহঃ ধৎবধ-এর কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকবে ওই এলাকার শিক্ষার্থীরাই কেবল সে প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারবে অন্য কোন এলাকা বা নির্দিষ্ট এ সীমানার বাইরের কোন শিক্ষার্থী এখানে পড়তে পারবেনা। অনেক দেশে এ পদ্ধতি চালু থাকলেও আমাদের দেশ নেই। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে আমাদের প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ই মানসম্মত প্রতিষ্ঠান হতে বাধ্য।
গত বছরের মাঝামাঝি থাকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা হওয়ার জল্পনা-কল্পনা চলছিলো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে লেগে যায় সেপ্টেম্বর মাস। সেপ্টেম্বরের সাত তারিখের ঘোষণায় প্রাথমিক শিক্ষার সমাপনী পরীক্ষা নিশ্চিত হয় এবং শিক্ষার্থীরা তখন থেকে প্রস্তুতি নেয়। ২১ নভেম্বর শুরু হয় পরীক্ষা। সকাল বিকাল অর্থাৎ একদিন দুই বিষয় করে পরীক্ষা হয়। একদিন দুই বিষয় করে পরীক্ষা নেয়ার প্রয়োজন কী ছিলো? মানলাম সরকার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা না নিয়ে তার পরিপূরক হিসেবেও এ পরীক্ষা নিচ্ছে। তাই বলে আগের বৃত্তি পরীক্ষার আদলে সকাল বিকাল পরীক্ষা নেয়ারতো কোনো প্রয়োজন ছিলো না।
একেতো ঘোষণাই হয়েছে দেরিতে মাত্র দুই মাস আগে, তার ওপর আবার দিনে দুই বিষয়ের পরীক্ষা। অবশ্য এসব কারণ থাকা সত্বেও শিশুরা যে পরীক্ষায় ভালো করেছে, তা ফলাফল দেখলেই বোঝা যায়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার একমাসের মাথায়ই শিক্ষার্থীরা পেয়ে যায় তাদের কাংখিত ফলাফল। মোট প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করলেও অংশগ্রহণ করে ১৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৬৫ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার আগেই একটা অংশ ঝরে পড়লো। এরপর অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাস করে মোট ১৬ লাখ ২০ হাজার ৫৪ জন। পাসের হার ৮৮.৮৪ ভাগ। যদিও এরমধ্যে গণিত ও ইংরেজীতে সর্বোচ্চ ১৩ নাম্বার গ্রেস দিয়ে আরো ৭ ভাগ শিক্ষার্থীকে পাস করানো হয়।
পাসের হার ৮৯ ভাগ ধরলেও এখানে ঝরে পড়েছে ১১ ভাগ শিক্ষার্থী। পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রথম বিভাগ পেয়েছে ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৭১৭ জন। দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ও তৃতীয় কিভাগ পেয়েছে ২৭ হাজার জন। অর্থাৎ ৪১.৭৭ পেয়েছে প্রথম বিভাগ, ৩৭.৯৮ ভাগ পেয়েছে দ্বিতীয় এবং ২০.২৫ ভাগ পেয়েছে তৃতীয় বিভাগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হিসেবে ৩৭ হাজার ২২৫টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাশ করেছে। আর ১ হাজার ৯৩৭টি প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
প্রাথমিক শিক্ষায় ১১টি ধারা থাকলেও দুঃখজনক হলেও সত্য তার অন্যতম ধারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা গত বছরের সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। কর্তৃপক্ষ নাকি তাদের কথা ভুলে গেছে। এ বছর থেকে অবশ্য তাদেরকে অন্তভুক্ত করা হবে। ফলে এ বছর মাদ্রাসা পড়–য়া কোনো শিক্ষার্থী এসে সাধারণ ধারার ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারছে না।
যাই হোক, সার্বিক বিবেচনায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা সফল সরকার ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বৃত্তি দেবে। বেশ ভালো কথা।
প্রাথমিক স্তরের সমাপনী পরীক্ষা চালু করার বিষয়ে কিছু যুক্তি দেখানো হয়েছে, ঝরে পড়ার হার কমানো, এনরোলমেন্ট বাড়ানো, আলাদাভাবে বৃত্তি ব্যবস্থা বাদ দেয়া ইত্যাদি। ঠিকই আছে, কিন্তু তাই বলে এসএসসির মতো দেশব্যাপী পাবলিক পরীক্ষার বোঝা শিশুদের মাথায় দেয়া কতটা কল্যাণের। কম টাকার মধ্যে ফরম পূরণ করা গেছে ঠিক আছে। এ পদ্ধতির খারাপ দিকও আছে। একটি দশ এগারো বছরের শিশুকে এভাবে পাবলিক পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়া মানে তার মাথায় একটা বোঝা চাপিয়ে দেয়া, যা বহন করতে সে সক্ষম নয়। এ বোঝা হলো পড়ার বোঝা। তার এবং তার অভিভাবকের মাথায় শুধু পাস করার চিন্তা। ফলে শিশুর ধারণ ক্ষমতার বাইরে তাকে পড়তে হবে। গত বছর দেখা গেছে অনেক অভিভাবকই আর সন্তানকে রাত ১২টা পর্যন্ত পড়িয়েছেন। রাজধানীর ভর্তি যুদ্ধেও তাই হয়। ফলে এবার দেখা গেছে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে পরীক্ষার হলেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাসমাপনীতে ফলাফলের যে বিন্যাস তা ও শিশু সুলভ নয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ এ ভর্তির ফলাফল দেয়া হয়েছে। যে শিশু প্রথম বিভাগ পায়নি, তার মনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ পাওয়ার বেদনা থাকতে পারে, যা তাকে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই কুঁকড়ে খাবে। সাথে সাথে আজীবন তাকে তৃতীয় শ্রেণীর সার্টিফিকেট নিয়ে থাকতে হবে। এরাতো পাস করলো বলা যায়, কিন্তু যারা পরীক্ষায় পাসই করেনি তারা তো ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারছে না। সে কী করবে? আরেকবার পরীক্ষা দেয়ার প্রেষণা সে কোথা থেকে পাবে। যেখানে তার সব সাথীরা তার উপরের শ্রেণীতে পড়ছে। এদেরকে পরবর্তী ধাপে ফিরিয়ে আনা যে কষ্ট হবে তা বলা যায়। দারিদ্র পিতা-মাতার পুনরায় পরীক্ষায় অংশ দিতে দেয়ার প্রেষণা ফুরিয়ে যাবে। এবার যদিও ১১ ভাগ শিশু পাশ করেনি, একটা বিরাট অংশ এ পরীক্ষায়ই অংশ নেয়নি। এদের জন্য সমাপনী পরীক্ষা কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বয়ে আনবে। এবার আসা যাক ৮ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার বিষয়ে। যাকে বলা যায় জুনিয়র এসএসসি। কিছুদিন হল সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানেও বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়টিকে বড় করে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ৮ম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষা না হয়ে একেবারে সমাপনী পরীক্ষা।
৫ম শ্রেণীর চেয়ে ৮ম শ্রেণীর এ সমাপনী পরীক্ষাই যুক্তিযুক্ত। ৮ম শ্রেণীকে আমরা শিক্ষার একটা ধাপ বলতে পারি। এ বয়সে তাদেরকে পাবলিক পরীক্ষার সম্মুখীন করাই যায়। অন্যদিকে এ স্তর অধিক উপযুক্ত, কারণ এবারের শিক্ষানীতিতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করার সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষানীতির এ প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা হবে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত। তখন প্রাথমিক স্তরের সমাপনী পরীক্ষা হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে এসএসসির মত এ পরীক্ষা নেয়া যায়। যার সার্টিফিকেটও জীবনের সর্বস্তরে কাজে লাগানো যাবে। এখন যেমন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরিতে ৮ম শ্রেণী পাশ করা প্রার্থী চাওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা বৈধ সার্টিফিকেট প্রার্থী দেখাতে পারবে। এখন দেখা যায় অনেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা না করে ও যেকোন প্রতিষ্ঠান থেকে পাশের নকল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে নকল শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ দেখায়। এবারের শিক্ষানীতিতে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর পর থেকে কারিগরি ভোকেশনাল তথা বাস্তবমুখী পাঠ্যপুস্তকের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা যথোপযুক্ত। প্রথম শ্রেণী হতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত আট বছরের শিক্ষা জীবনের অর্জন যেন তার জীবনের অর্জন হয়। অর্থাৎ ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েও সে যাতে তার পরবর্তী জীবন সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারে সেটি নিশ্চিত করা। ঠিক যে কারণে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৫ম থেকে বাড়িয়ে ৮ম শ্রেণী করার প্রস্তাবনা এসেছে, একই কারণে ৮ম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষা নেয়া দরকার। সরকার একই সিলেবাসের কথা বলেছে। ৮ম শ্রেণী সমাপনী পরীক্ষায় একই সিলেবাস হরে মাদ্রাসা যাবে কোথায়? তাহলে কি গতবারের ৫ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার মতো অষ্টম শ্রেণীতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বঞ্ছিত করা হবে। এ বছর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করতে মাদ্রাসা এবং স্কুলে দুই সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। অবশ্য এ ব্যাপারে মাত্র সিদ্ধান্ত হয়েছে। তা বাস্তবায়নের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সভাপতি করে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের সুপারিশ দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
গত বছর থেকে যে ৫ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা চালু হয়েছে তা নিয়ে অনেকের দ্বিমত রয়েছে। এটা বাদ দেয়ার পক্ষে কথা বলেছেন অনেক অভিভাবকও। তারা মনে করছেন, ৫ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা বাদ দিয়ে একেবারে ৮ম শ্রেণীতেই সমাপনী পরীক্ষা হবে। তবে যেহেতু ৫ম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে এটাকে বাতিল না করে শিশু উপযোগী কিছু সংস্কার করা যেতে পারে।

নদী বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে (ৈদিনক েডসিটিন ১৩ জানুয়াির ২০১০)


নদী বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে
মাহফুজুর রহমান মানিক
ঢাকার সাথে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চারশ বছরের ঢাকা বুড়িগঙ্গাকে নিয়েই। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী-এ বাক্যটির সাথে আরেকটি বাক্য চলে আসে-ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। বুড়িগঙ্গার সাথে ঢাকা, এটি বাস্তব। এখন যদি বলা হয় দশ বছর পর এটি হবে ইতিহাস। (অর্থাৎ তখন বলা হবে দশ বছর আগে ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ছিলো। এখন যেমন বলে এক সময়ের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নয়, আগে ছিলো।) কেউ বিশ্বাস করবে? আমার মনে হয় বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচালের আগে, কথাটি শুনে আতকে ওঠবেন। আতকে ওঠারই কথা। কারণ আমরা চাই না বুড়িগঙ্গা হারিয়ে যাক। এটি স্থান নিক ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত করুন। এই মুহূর্তে কেউ বুড়িগঙ্গা দেখতে যান। সনাক্তই করতে পারবেন না এটি নদী না অন্য কিছূ। বিশেষ করে কামরাঙ্গীর চরে বুড়িগঙ্গার তীরে প্রথম কেউ গেলে ভাববে এটি হয়তো খাল নয়তো নর্দমা। একদিকে এর সীমানা সংকীর্ণ হয়ে গেছে, দখলদাররা এর তীরে তাদের প্রভূত্ব স্থাপন করেছে। অন্যদিকে এর পানি দূষিত হয়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে, চারদিকে ভীষণ দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অর্থাৎ নদী বলার মতো দৃশ্য বিদ্যমান নেই। এ মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে অনেকদিন ধরে আন্দোলন করছেন পরিবেশবাদীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের অন্যতম। বুড়িগঙ্গা বাঁচানোর আন্দোলন ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। গত বছর এ নিয়ে গণমাধ্যম এবং সুশীল সমাজে আলোচনার ঝড় উঠে। শুধু দাবী দাওয়া পেশ আর মানব বন্ধনই নয়, আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এটি। অবশেষে টনক নড়ে সরকারের। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, ঢাকার চারপাশে অবস্থিত অন্যান্য নদী তুরাগ, বালুও শীতলক্ষাকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক অবস্থায় নদীকে দখলমুক্ত করতে চেষ্টা করে। সে ধারাবাহিকতায় এ বছরের ৬ জানুয়ারি বুড়িগঙ্গার তলদেশ থেকে বর্জ্য ও পলিথিন অপসারণের কাজ শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর বাদামতলীর দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু হতে শ্যামবাজার পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকার বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে। ৬ জানুয়ারি চার মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে এ কাজ শুরু হয়। সেদিন বুড়িগঙ্গা ছিলো উতসবের নগরী। হাজার হাজার মানুষ এ কাজকে স্বাগত জানাতে নদীর তীরে ভীড় করে। কেউ অবার নৌকায় যোগ দেয় নদীর মাঝখানে। এভাবে সকলের হাততালির মাধ্যমে কাজের উদ্বোধন হয়। তিন মাসের প্রজেক্টে এ কাজ চলছে। এর আগে অদালতের নির্দেশে বলা চলে সরকার নদীর তীরের অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলো। সে কার্যক্রম কতটা সফল হয়েছে বলা যায় না। তবে বাস্তবতা দেখে সে কার্যক্রম মুখথুবড়ে পড়েছে বললেও অত–্যক্তি হবে না। সেখানে অবৈধ দখলদারিত্বতো উচ্ছেদ হয়নি, বরং নির্মিত হয়েছে স্থায়ী অস্থায়ী দোকানপাট গুদামসহ অনেক কিছু। এখনো বুড়িগঙ্গাসহ অন্যান্য নদীর তীর ঘিরে রয়েছে নানা স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান। শিল্প প্রতিষ্ঠান, কারখানা, দোকান, বসত বাড়ি এমনকি মসজিদ মদ্রাসাও। বুড়িগঙ্গার সীমানায় অনেকেই নিজের জমি দাবী করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। কেউ আবার বুড়িগঙ্গা ভরাট ও করছে এবং সেখানে স্থাপনাও তুলছে। এ অবস্থায় নদী কতটা অত্যাচারিত তা সহজেই অনুমেয়।সরকার বুড়িগঙ্গার তলদেশ থেকে বর্জ্য উত্তোলনের পদক্ষেপ নিয়েছে। ভালো কথা। এর মাধ্যমে এ বর্জ্যরে স্থায়ী সমান হবে কী-না। একেতো এ বর্জ্য উত্তোলনের ভালো ড্রেজার আমাদের নেই, তার ওপর আবার উত্তোলিত বর্জ্য কোথায় রাখবে তা নিয়ে রয়েছে টানা হেঁচড়া। আবার কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে বর্জ্য উঠানো হচ্ছে, সে বর্জ্য যে আবার বুড়িগঙ্গায় পড়বে না তার নিশ্চয়তা কী। অর্থাৎ যে সমস্ত কারণে বুড়িগঙ্গার পানির এ দৈন্য দশা সেগুলো চিহ্নিত করে তার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে এ কার্যক্রম কোন কাজ দেবে না।বুড়িগঙ্গা এতোদিন পরিণত হয়েছে বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে। এটি ব্যবহৃত হচ্ছে ঢাকার প্রধান স্যুয়ারেজ বর্জ্যরে আউটলেট হিসেবে। শিল্প কারখানার বর্জ্য, মেডিকেলের বর্জ্য, ট্যানারির বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ, হাটবাজারের পরিত্যক্ত সামগ্রী, শিশি, বোতল, পলিথিন ইত্যাদি ফেলার স্থান হিসেবে বুড়িগঙ্গা ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে নাব্যতা হারিয়েছে বুড়িগঙ্গা, পানি হয়েছে সীমাহীন দূষিত। এগুলো শক্ত হয়ে জমাট বেধে কয়েক স্তর তৈরি করেছে নদীর তলদেশে। নানা প্রকার রাসায়নিক পদার্থও ভর করেছে বুড়িগঙ্গায়। বর্তমানে সেখানে মাছ দূরে থাক, সামুদ্রিক কোন প্রাণী এমনকি উদ্ভিদও নেই। এ অবস্থায় বর্জ্য উত্তোলন আর নদী খননের কাজ সময়ের দাবী, অত্যন্ত আশাপ্রদ কার্যক্রম। এ বর্জ্য উত্তোলন আর নদী খননের কাজকে ফলপ্রসু করতে, স্রোতস্বীনী বুড়িগঙ্গার আসল চেহারা ফিরিয়ে দিতে কিছু কাজ করা জরুরী। প্রথম কাজটি হবে নদী দখল মুক্তকরণ। শুধু বুড়িগঙ্গার নয় ঢাকার চারপাশের অন্যান্য নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকরণ। এ ব্যাপারে গত বছর যে কাজ হয়েছিলো তা থমকে দাঁড়ায়। ক্ষমতাবানরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এসব শক্তিমানদের বিষয়ে অনেক সময় নাক গলাতে সরকার ও নারাজ। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ জরুরী। তাই প্রথমে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে, সে সীমানায় অবস্থিত সকল অবৈধ স্থাপনা সরাতে হবে। এরপর এখন সরকার যে কাজটি করছে, অর্থাৎ বর্জ্য উত্তোলন। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে এটি আবশ্যক। এ কাজের সফলতার জন্য, যে সব শিল্প কারখানার কারণে নদী দূষিত হচ্ছে, সেগুলোর প্রত্যেককে বর্জ্য ফেলার জন্য ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তথা ইটিপি স্থাপনের জন্য বাধ্য করতে হবে। আজকের বুড়িগঙ্গা হাজারী বাগের যে চামঢ়া শিল্পের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত-এ শিল্প কে দ্রুত সাভারে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া বর্জ্য ফেলার জন্য ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা, মহানগরীর মানুষের জন্য বিকল্প পানি ও পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থা করা জরুরী।এসব বিষয়ের বন্দোবস্ত না করে শুধু বর্জ্য উত্তোলন করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অবশ্য আশাপ্রদ, চমকপ্রদ খবর হলো প্রধানমন্ত্রী গত বছর পরিবেশ দিবসে ও সংসদে নদীর ব্যাপারে বিশেষ নজর দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পরিবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মাথা ব্যথা যে কতটা তীব্র তা আমরা ডিসেম্বরের কোপেনহেগেন সম্মেলন থেকে ধরে নিতে পারি। যদিও অবশেষে সে সম্মেলন নোপেনহেগেন এ পরিণত হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রীর সে নজর আছে বলেই এখন কার্যক্রম চলছে এবং নদী রক্ষায় সরকারের অনেক কার্যক্রম হাতে রয়েছে। নদীর বিষয়ে রয়েছে শক্তিশালী টাস্কফোর্স। যারা নদীর সমস্যা নির্ধারণ করে তা হতে উত্তরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। বর্জ্য উত্তোলনের কাজ এ টাস্কফোর্সো নির্দেশ।বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। অথচ শুধু ঢাকা শহরের নদীই নয়, গোটা দেশের নদীগুলোর অবস্থা শোচনীয়। দেশে মোট নদীর সংখ্যা ২১০টি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক নদী ৫৪টি। একদিকে দেশের নদীগুলো আমাদের দ্বারাই দখল আর দূষণে যায যায় অবস্থা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি চুক্তি নিয়ে নিয়মিত দর কষাকষি করতে হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে। কিছুদিন ধরে তিস্তা পানি বন্টন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রাকক্কালে, গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। তিস্তা পানি বন্টনের দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত বিষয়টির একটা দফারফা হওয়ার দিকে সবাই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু এর পরেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়ে দিলেন এ সফরে তিস্তা পানি বন্টন নিয়ে কিছু হচ্ছে না। ঢাকার সাথে যেমন নদীর সম্পর্ক তেমনি বিশ্বের অন্যান্য শহরের সাথে নদীর সম্পর্কে ও আমরা জানি। অবশ্য চীনের দুঃখ হোয়াংহোকে বাদ দিয়ে ল-নের কথা বললে সাথে সাথে আসবে এক সৌন্দর্য্যের আধার টেমস নদীর কথা। কানাডার টরেন্টোর কথা বললে আসবে চোখ জুড়ানো লেক অন্টারিওর কথা। আমেরিকার নিউইয়র্ক আর শিকাগো শহরের কথা বললে হার্ডসন নদী আর লেক মিশিগানের কথা বলতে কেউ ভুলবে না। অস্টোলিয়ার সিডনির মারো ডার্লিং নদীর কথা ও আমরা জানি। এগুলোর সাথে ঢাকার কথা বলরে বুড়িগঙ্গা আসবে ঠিকই কিন্তু সেটা আর নায়াগ্রার মত চোখ ধাঁধাঁনো হবে না। তুরাগ শীতলক্ষা আর বালুর কথা আসবে ঠিকই সেটি আর হবে না পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।আজকে সীমাহীন সংকটে মেগাসিটি ঢাকা। জানযট, জনসংখ্যা আর গাড়ির চাপে ঢাকা একদিকে যেমন ন্যুব্জ। আবার গ্যাস, বিদ্যুৎ আর পানির সংকটে সংকটাপন্ন। সে অবস্থায় নদীগুলো যদি নাগরিকদের শান্তি দিতো স্বস্তিতে দাড়ানোর পথ করে দিতো তাও সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত মানুষ একটু শান্তি পেত। অথচ বাস্তবতা হল এ নদীগুলো আজ বিলুপ্তির পথে। একশ্রেণীর মানুষের অত্যাচারে নদীগুলোর প্রাণ যায় যায়। ঢাকাকে জেনেছে এমন একজন পর্যটককে ধরি যিনি ঢাকার সাথে বুড়িগঙ্গাকে জেনে এসেছে, ঢাকায় আসার পর। বুড়িগঙ্গা দেখার পর তার কাছে বুড়িগঙ্গাকে ডাস্টবিন ছাড়া অন্য কিছু মনে হওয়ার কথা না। বুড়িগঙ্গার পানিকে আমরা যতই কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময় কিংবা ব্যবহারের অযোগ্য বলি না কেন একশ্রেণীর মানুষ এ পানি দিয়ে জীবন ধারণ করছে। গোসল, খাওয়া হতে শুরু করে কাপড় ধোওয়া পর্যন্ত সকল আজ এ বুড়িগঙ্গার পানি দ্বারাই সম্পন্ন করছে। ফলে এ সব মানুষ যারা বুড়িগঙ্গার তীরে বাস করেন, সারা বছরই তারা নানা রকম রোগে ভুগে থাকে। খোঁচ পাচড়া, চামড়ার নানা রোগসহ পেটের পীড়ায় ভুগছেন। এদের বুড়িগঙ্গা ছাড়া কোন পথ নেই। এ অবস্থায় বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার অন্যান্য নদীগুলো বাঁছানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমনিতে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার। তার উপর পরিবেশ বিপর্যয় আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ঢেকে আনতে পারে। সে পরিবেশ রক্ষায় নদীগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকার ক্ষেত্রে এটা চিরন্তন সত্য। ঢাকার নদীগুলো বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে। ঢাকাকে বাঁচাতে সরকারের এ পদক্ষেপ গুলো অত্যন্ত ফরপ্রসু হওয়া চাই। এ ব্যাপারে স্থানীয় জনসাধারণের দায়িত্ব ও কম নয়। তাই ঢাকাকে বাঁচাতে মৃতপ্রায় নদীগুলো বাঁচাতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। য়

ইতিহাসের ধারায় এবারের শিক্ষানীতি:সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

ইতিহাসের ধারায় এবারের শিক্ষানীতি:সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ (ৈদিনক েডসিটিন ০৯ িডেসম্বর ২০০৯ প্রকািশত)


মাহফুজুর রহমান মানিক
আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে শিক্ষানীতির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীন বাংলার সূর্যাস্তের মধ্যদিয়ে যার সূচনা। ব্রিটিশরা এ সময়ে রাজত্ব পায়। শিক্ষানীতি/শিক্ষা কমিটি/শিক্ষা কমিশন কিংবা শিক্ষা ভাবনা অবশ্য আরো আগের। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদমকে (আ.) আল্লাহতায়ালা জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, ফলে ফেরেস্তারা সেজদা করে আদমকে। বলা চলে শিক্ষার শুরুটা সেখানে। তবে জাতি হিসেবে, ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দা হিসেবে আমাদের ইতিহাসকে পনের শ’ শতক থেকে ধরি। ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল অতুল ঐশ্বর্যে ভরপুর। পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে এখানে আসে পর্তুগিজরা। ধীরে ধীরে আসে ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ এবং দিনেমাররা। শুরুতে তাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকলেও তারা শিক্ষা বিস্তারের কাজও শুরু করে। তাদের সঙ্গে আসে মিশনারি দল, যারা এ শিক্ষা বিস্তারের কাজ করে। ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত যতদিন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেনি ততদিন এ মিশনারিরাই তাদের শিক্ষা ও ধর্ম বিস্তারের কাজ করে। এরপর ১৭৯২ সালে চার্লস গ্রান্টের শিক্ষা সংক্রান্ত সুপারিশ, ১৮১৩ সালে কোম্পানির শিক্ষা সনদ, ১৮৫৩ সালে লর্ড মেকলে কমিটি, ১৮৫৪ সালের চার্লস উডের শিক্ষা বিষয়ক ডেসপ্যাচ, ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯৩৪ সালের সাপ্রু কমিটি এবং ১৯৪৪ সালের সার্জেন্ট কমিটি-ইত্যাদি ছিল ব্রিটিশ আমলের শিক্ষার নীতি/কমিটি/কমিশন। ইংরেজদের এসব শিক্ষা চিন্তা কখনোই আমাদের কল্যাণে ছিল না। তাদের পদানত জাতি হিসেবে ব্যবহারই ছিল মূল লক্ষ্য। এগুলোর মাধ্যমে আমাদের চিন্তা, চেতনা ব্রিটিশদের মতো করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে লর্ড মেকলের শিক্ষার তত্ত্বটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- ডব সঁংঃ ধঃ ঢ়ৎবংবহঃ ফড় ড়ঁৎ নবংঃ ঃড় ভড়ৎস ধ পষধংং যিড় সধু নব রহঃবৎঢ়ৎবঃবৎং নবঃবিবহ ঁং ধহফ ঃযব সরষষরড়হং যিড়স বি মড়াবৎহ-ধ পষধংং ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ওহফরধহ রহ নষড়ড়ফ ধহফ পড়ষড়ঁৎ নঁঃ ঊহমষরংয রহ ঃবংঃবং রহ ড়ঢ়রহরড়হং রহ সড়ৎধষং ধহফ রহঃবষষবপঃ.অর্থাৎ- এই মুহূর্তে এমন এক শ্রেণী সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে যে শ্রেণী আমাদের এবং লাখ লাখ শাসিতদের মধ্যে ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা পালন করবে। এ শ্রেণী এমন এক শ্রেণী হবে যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়। কিন্তু রুচি, অভিমত, নীতিবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ। এ ছিল ইংরেজদের শিক্ষা চিন্তা।ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ এ ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব। বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। এ পাকিস্তান আমলেও শিক্ষা নিয়ে নানা কমিটি ও কমিশন হয়। ১৯৪৯ সালের পূর্ববঙ্গ শিক্ষা পুনর্গঠন কমিটি, ১৯৫২ সালের মাওলানা আকরম খা কমিটি, ১৯৫৭ সালের আতাউর রহমান খানের এডুকেশন রিফর্ম কমিশন, ১৯৫৯ সালের নূর খান কমিশনের রিপোর্ট ইত্যাদি এর অন্যতম চিত্র। ইসলামী চেতনা নিয়ে গঠিত মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানে এসব শিক্ষা চিন্তায় সাধারণ শিক্ষাসহ মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়টিও উঠে আসে। কিন্তু বছর বছর কমিশন আর কমিটির তোড়ে তেমন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। এ সময়ে ধর্মীয় বাধা, ভাষাগত বাধা এবং সুবিধাভোগীদের বাধার কারণে এসব রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সাবভৌম দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। যে চেতনা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে এ নবীন সূর্যের প্রকাশ, তার জন্য শিক্ষাও ছিল অপরিহার্য। ’৭১-এর স্বাধীনতার পরের বছরই ১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৭৪ সালে কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের পর ওই প্রতিবেদন বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে। এরপর ১৯৭৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষা উপদেষ্টা কাজী জাফরের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে।১৯৮৩ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আব্দুল মজিদ খানের নেতৃত্বে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনা কমিশন গঠন করলেও ছাত্র বিক্ষোভের মুখে এ কমিশন বাতিল হয়। ১৯৮৬ সালে মফিজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখে এ কমিশনও বাতিল হয়।১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার প্রাথমিক ও শিক্ষাবিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করে। এর সভাপতি ছিলেন বিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ আল- মুতী-শরফুদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকার এসে আবার ১৯৯৭ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল হকের নেতৃত্ব ৫৬ সদস্যের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে কমিশন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এটি বাস্তবায়নে সুপারিশ মূল্যায়ন ও অর্থায়নের জন্য ১৯৯৮ সালে ড. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়।২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমএ বারীর নেতৃত্বে শিক্ষা সংস্কার বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। চারদলীয় জোট সরকার ২০০২-এর ২১ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৪ সালের মার্চে কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়।এ ছিল আমাদের শিক্ষানীতির ইতিহাস। যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকারই করেছে শিক্ষানীতি, শিক্ষা কমিশন। স্বাধীনতার ৩৮ বছরে গড়ে ৪টি করে রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। সংখ্যাধিক্যের বিচারে রিপোর্টগুলো যতটা গর্বের, এর ইতিহাস কিন্তু ততটা সুখকর নয়। দেশের অর্থ, মেধাবীদের সময়ও শ্রম গেলেও আলোর মুখ দেখেনি একটি রিপোর্টও। রাজনৈতিক মতদ্বৈততা, সংকীর্ণ মন, সুদূরপ্রসারী চিন্তার অভাবেই রিপোর্টগুলো খসড়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে।২০০৪ সালের মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের পর ২০০৬-এর চারদলীয় জোটের মেয়াদ শেষ হয়। ২০০৭-০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনপূর্ব ১৩ ডিসেম্বর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। ইশতেহারের ১০ নং পয়েন্টে শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিরোনামে আওয়ামী লীগের শিক্ষা ওয়াদা বর্ণিত হয়। বলা হয় ১০.১ মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা, বিজ্ঞান, ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে যুগোপযোগী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। ২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি ১০০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করা হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণমুক্ত, শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতন কাঠামো ও স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন এবং স্বতন্ত্র কর্মকমিশন গঠন করা হবে। পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক সেবায় পরিণত করা হবে।১০.২ নারী শিক্ষা উৎসাহিত করার লক্ষ্যে উপবৃত্তি অব্যাহত রাখা হবে।১০.৩ শিক্ষাঙ্গন সন্ত্রাস, সেশনজটমুক্ত করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে তোলা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হবে। বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণাকর্মের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে।নির্বাচনী এ ওয়াদা মতে ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ জাতীয় শিক্ষানীতি-২০০৯ কমিটি গঠন করে। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে প্রধান করে এবং ড. কাজী খলীকুজ্জমানকে কো-চেয়ারম্যান করে মোট ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে অন্যতম সদস্য অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ৮ এপ্রিল-২০০৯ কমিটি ঘোষণা হয়। ৩ মে কমিটির প্রথম বৈঠক বসে। ২ সেপ্টেম্বর কাজ শেষ হয়। কাজ করে শিক্ষানীতি-২০০৯ এর চূড়ান্ত খসড়া শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জমা দেয়। আরো পরে এসে খসড়াটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট িি.িসড়বফা.মড়া.নফ-তে দেয়া হয়। এখনও পিডিএফ ফরমে এ ওয়েব সাইটে আছে। ২৯টি অধ্যায় এবং সাতটি সংযোজনীর সমন্বয়ে করা হয় এ নীতি। খসড়া শিক্ষানীতি প্রকাশ করে এর ওপর পরামর্শ, মতামত জানানোরও সুযোগ দেয়া হয়। প্রথম ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মতামত জানানোর সুযোগ ছিল, পরে অবশ্য অনেকের অবেদনের প্রেক্ষিতে ১৫ দিন সময় বাড়িয়ে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাখা হয়। এখন ডিসেম্বর মাস। এ ডিসেম্বরেই এ নীতি চূড়ান্ত হওয়ার কথা। জানুয়ারি-২০০৯ থেকে বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়ার কথা আছে। এবারের শিক্ষানীতি সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ যেমন বাস্তবায়নের আবার জাতীয় ঐকমত্যেরও। ৮৮ ভাগ মুসলমানের দেশে এ নীতি কতটা জনসমর্থিত। কত ভাগ মানুষ সেক্যুলার শিক্ষানীতি চান সেটা দেখার বিষয়। শিক্ষানীতির সূচনাতেই এসে বিতর্কিত একটি বিষয়ের অবতারণা কখনোই বাস্তবসম্মত ছিল না। কারণ সেক্যুলার বললেও কিন্তু সেটা বাস্তবে ফলেনি। প্রাক-প্রাথমিকে যে মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডার কথা বলা হয়েছে সেটা এর সাংঘর্ষিক। আমার মনে হয় শিক্ষানীতির চূড়ান্ত কপিতে সেক্যুলার শব্দটি অযথা রাখার প্রয়োজন নেই। এবারের শিক্ষানীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা বললে প্রথমেই আসবে স্তরবিন্যাসের কথা। প্রাথমিক স্তর পঞ্চম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা। আর মাধ্যমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী। এরপর উচ্চ শিক্ষা। মাঝখানের উচ্চ মাধ্যমিককে বাদ দিয়ে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণীর পূর্বে প্রাক প্রাথমিক স্তর বাড়ানো হয়েছে। এখন আমরা স্তরবিন্যাসে বলবো প্রাথমিক, মাধ্যমিক আর উচ্চ শিক্ষা। আরেকটু বলতে হবে প্রাথমিকের আগে রয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। শিক্ষার এ স্তরবিন্যাস বাস্তবে রূপ দেয়া সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ, এর সঙ্গে আবার আছে শিক্ষকদের বেকারত্বের ঝুঁকি। সরকারের অর্থায়ন এখানে বড় ভূমিকা পালন করবে। এটা ঠিক বাস্তবতা বলে এ স্তরবিন্যাস যথার্থ, তবে সেটা বাস্তবায়নের জটিলতা কম নয়। কারণ বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোরই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক, আসবাবপত্রের দারুণ সংকট। এগুলো কাটিয়ে উঠে নতুন করে স্তরবিন্যাস, দুটি স্তরের সমন্বয়সাধন যেমন ব্যয়বহুল তেমনি সময়সাধ্য ব্যাপার। তারচেয়ে বড় কথা হলো যে উদ্দেশ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত করা হবে সে উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে, বাস্তবতা হচ্ছে প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া অর্ধেক শিশুই পঞ্চম শ্রেণীর মধ্যে ঝরে পড়ে। এদেরকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে সরকারের যে কৌশল তা কতটা কার্যকর হবে।এবারের শিক্ষানীতি কমিটি গঠনের প্রাককালে এবং এর পরবর্তীতে একমুখী শিক্ষার অনেক তোড়জোর শুনেছি। আসলে একমুখী শিক্ষার ব্যাপারে গর্জন যতটা ছিল, বর্ষণটা সেভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষায় মাদ্রাসার কথা আসলেও আসেনি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কথা। এখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়টি দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। মাদ্রাসা শিক্ষার যুগোপযোগী করার সঙ্গে এর স্বকীয়তা রক্ষায় আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় ১ম ও ২য় শ্রেণীতে আবশ্যিক হিসেবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত রাখা হয়েছে আর অতিরিক্ত হিসেবে আরবি রাখা হয়েছে, এখানে কুরআন রাখা অপরিহার্য। মাধ্যমিকে এসেও মাদ্রাসার কিছু বিষয় কমিয়ে ফেলা হয়েছে। স্কুলে ললিতকলা বিষয়টি দেয়ার ব্যাপারে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রাথমিকে আবশ্যিক হিসেবে আছে। অবশ্য মাধ্যমিকে সেভাবে নেই।উচ্চ শিক্ষায় আমাদের যে গবেষণার অভাব তার ওপর শিক্ষানীতিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো এ গবেষণার জন্য যা প্রয়োজন, যে বাজেট দরকার সরকার তার কতটা দিবে। ভোকেশনাল শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা তথা বাস্তবমুখী শিক্ষার বিষয়টিও শিক্ষানীতিতে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আর শিক্ষক সংকট সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। মোদ্দাকথা হলো গোটা শিক্ষানীতিতে ভালো চিন্তার অভাব ছিলো না। কিন্তু এসব কিছুর বাস্তবায়ন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জই বটে। আমরা ২০১২ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ১০০ ভাগ ভর্তি করাতে পারবো কি না, ৪৭ ভাগ নিরক্ষর মানুষকে অক্ষরজ্ঞান বা সাক্ষর করতে আমাদের কতদিন প্রয়োজন সেটা মৌলিক প্রশ্ন। ডিজিটাল বাংলাদেশের কথাই বলি আর স্বপ্নের বাংলাদেশের কথাই বলি, আমরা বাংলাদেশকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষা। আর শিক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষানীতি। এটা সত্য যে জাতি হিসেবে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ নিয়ে আমরা ৩৮ বছর অতিক্রম করছি, অথচ আমাদের এ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষানীতি নেই। এ পর্যায়ে এসে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামী দিনে বা আগামী কত দিনে দেশকে কোন পর্যায়ে নেব। চলমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট কেমন। প্রযুক্তির, জ্ঞানের, মেধার, প্রতিযোগিতার বর্তমান বাজার বিরূপ। আগামী ১০০ বছর পর এটা কোন পর্যায়ে পৌঁছবে। আমাদের বাধা কি কি। প্রাধান্যের ক্ষেত্র কোনগুলো ইত্যাদি ভেবে একটি সুচিন্তিত, সুদূরপ্রসারী শিক্ষানীতি প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে এ শিক্ষানীতি ঠিক কতটা উপযোগী, এর বাস্তবায়ন কতটা সহজসাধ্য কিংবা কঠিন, কতদিনে বাস্তবায়ন হবে, বাস্তবায়ন হলে আদৌ কোনো পরিবর্তন হবে না ইত্যাদি ভেবেই এটা চূড়ান্ত করা দরকার। শিক্ষানীতিতে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাখা হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা আছে বটে কিন্তু সেটা পারতপক্ষে আমাদের কতটা ফল দেবে তা দেখতে বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জই থাকুক তার মোকাবিলায় প্রথমে প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। এ জন্য শিক্ষানীতি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে জাতির মতামত ও পরামর্শগুলো গ্রহণ করা দরকার। আমরা ঐকমত্যে পৌঁছলে যে সরকারই আসুক সেটা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে শিক্ষানীতি বা কমিটি/কমিশনগুলোর অতীত ইতিহাস কখনোই সুখকর ছিল না। অতীতের দিকে না তাকিয়ে এবারের শিক্ষানীতি দ্রুত বাস্তবায়নে হাত দিতে হবে। অবশ্য সূচনাটা এবারের ভালোই- মাত্র তিন মাসে রিপোর্ট জমা দিয়েছে কমিটি, যদিও শেষ দু’সপ্তাহ অনেক কষ্ট করেছেন সদস্যরা। সরকারও ক্ষমতায় এসেই ৯ মাসের মধ্যেই জাতিকে খসড়া শিক্ষানীতি উপহার দিয়েছেন। প্রথম থেকে সরকারের এ নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ়কণ্ঠ রয়েছে। শিক্ষাখাতে সামনে বরাদ্দের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত শিক্ষানীতি প্রকাশ করে। জানুয়ারি-২০১০ থেকে বাস্তবায়নের কাজ দিলে সরকার তার চ্যালেঞ্জে সফল হবে বলে মনে হয়।

জাতীয় শিক্ষানীতি (ৈদিনক েডসিটিন ২৪ মার্চ ২০১০)

জাতীয় শিক্ষানীতি
মাহফুজুর রহমান মানিক
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০০৯ এর খসড়া প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর। পরামর্শের আলোকে এ বছরের জানুয়ারিতেই শিক্ষানীতি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিলো। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে মার্চও শেষ হওয়ার পথে। এখনও শিক্ষানীতি চূড়ান্ত হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭৩ এর কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনসহ অনেক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে, কমিটি প্রতিবেদনও পেশ করেছে, কার্যত এ প্রতিবেদন বাস্তবে ফলেনি। এরপরও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে করলো ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০০৯। এ শিক্ষানীতির প্রয়োজনীয়তাটা কী। মৌলিকভাবে যদি শুধু শিক্ষানীতির প্রশ্নে আসি, কী প্রয়োজন একটি শিক্ষানীতির? আমাদের শিক্ষাতো জগাখিচুড়ি বলি আর যাই বলি এক রকম চলছেই। এর আর নীতির কী আছে?উত্তরটা শিক্ষানীতির নাম পড়লেই স্পষ্ট হয়। আমাদের শিক্ষানীতির নাম ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’। অর্থাৎ আমরা একটি জাতি, বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের নাগরিক। এ রাষ্ট্রটি তার স্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে, তার জাতির জন্য শিক্ষার একটি নীতি প্রণয়ন করছে। শিক্ষার এ নীতি রাষ্ট্র করছে তার জাতিকে টিকিয়ে রাখতে। ঠিক এ প্রশ্নে অর্থাৎ জাতীয় ও জাতীয়তার প্রশ্নে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯ কতটা আন্তারিক বা আমাদেও রাষ্ট্র যে ধরনের জাতি গড়তে চাচ্ছে, সে জাতি গড়তে এ শিক্ষানীতির নির্দেশনা, লক্ষ্য উদ্দেশ্য, কর্মসূচি কী-সেটাই এখন দেখা যাক।স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষানীতির সূচনায় জাতীয়তার বিশ্লেষণ আসার কথা, কিন্তু সূচনাতে ভূমিকা শিরোনামে তিন পৃষ্ঠার বয়ানে চোখে পড়ার মত সে রকম কিছুই নেই। আছে কিছুটা রাজনৈতিক বয়ান, কমিটির কাজের বয়ান আর কিছু আপ্ত বাক্য (গণতান্ত্রিক উপযুক্ত মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন, প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে যোগ্য হয়ে টিকে থাকা ইত্যাদি)ভূমিকার পর যে শিক্ষানীতি করা হলো তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকাই ছিল যথার্থ্য, বাস্তবে শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেও বর্ননা না দিয়ে অধ্যায় -১ শিরোনামে দেয়া হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, ধরে নেয়া যাক এটিই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এখানে উদ্দেশ্য হিসেবে কতগুলো গুণের কথা বলা হয়েছে-মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, কুসংস্কারমুক্ত, পরমত সহিষ্ণু, দেশপ্রেমিক ইত্যাদি গুণ সমৃদ্ধ নাগরিক তৈরি।নীতি হিসেবে শিক্ষানীতিতে সেক্যুলার, গনমুখী, সুলভ, সুষম, সার্বজনীন, সুপরিকল্পিত এবং মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে মোট ২৮ টি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনায় অনুপ্রাণিত, জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারার প্রজন্ম ইত্যাদি। এগুলো ‘জাতীয়’ কথাটিকে প্রতিনিধিত্ব কওে বটে কিন্তু কোনটাই, পূর্ণাঙ্গ, সুস্পষ্ট এবং বিস্তারিত আসেনি। বর্ণনা এতো ঢিলেঢালা মনে হয় (আপাত দৃষ্টিতে) এগুলো না হলেও চলে। নীতির কথায় আসা যাক। অবশ্য এ নীতির কথা আগেই কিছুটা এসেছে। প্রথম বিষয়টা হলো জাতীয় শিক্ষানীতি হিসেবে জাতির নীতি বা জাতীয়তার নীতি আসেনি। গোটা শিক্ষানীতির ২৯ টি অধ্যায় আর সাতটি সংযোজনীর মধ্যে সবগুলো বিষয়ই নীতির প্রশ্নে যৌক্তিক হওয়া ছিলো বাস্তবতা। কিন্তু শিক্ষানীতিতে এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে যেসব বিষয় নীতির বাইরে স্রেফ কর্মসূচি হিসেবে আনা যায়। ভালোভাবে দেখলে মনে হবে এটি শিক্ষানীতি না হয়ে শিক্ষাকর্মসূচি হয়ে গেছে। জাতীয়তার প্রশ্নতো আগেই উধাও। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়তাকে যদি আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই, বা জাতি হিসেবে একজাতি উপহার দিতে চাই এখানে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা থাকবে কেন? কেনইবা আলাদে স্রোতে মাদ্রাসা আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকবে। আমাদের জাতিকে কোথায় দাঁড় করাতে চাই, রোডম্যাপ কী ইত্যাদি বিষয় না এসে শুধু একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৈরি এ মুখস্ত বুলিই আওড়ানো হয়েছে।স্বাধীনতা পরবর্তী কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন ছিলো জাতীয়তার প্রশ্নে কিছুটা আন্তরিক। এ কমিশন তার প্রতিবেদনের অধ্যায় এক এ শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলী শিরোনামে যে আলোচনা করেছে, সেখানে তখনকার সংবিধানের মূলনীতির আলোকে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি ভালোভাবে বলতে চেয়েছে। সাথে সাথে কেমন নাগরিক গড়তে চায় তার আলোচনাও সেখানে মোটামুটি স্পষ্ট। আর শিক্ষানীতির নীতির কথা বললে এর আগের মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন-২০০৩ প্রথমেই স্পষ্ট করেছে। ২০০৩ এর এ কমিশন রিপোর্টেও শুরুতেই এসেছে মৌলিক নীতিসমূহ শীর্ষক শিরোনাম। সেখানে নীতির প্রশ্নে শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী হবে, শিক্ষার সুযোগ কারা পাবে, শিক্ষার গুণগত মান কেমন হবে, বিদ্যালয়ে ভর্তিও বয়স কত হবে, শিক্ষা কাঠামো কী হবে, উচ্চ শিক্ষা কেমন হবে, ভাষা নীতি কী হবে ইত্যাদি ৩০ টি মৌলিক নীতি এসেছে।এবারের শিক্ষানীতির মৌলিক সংস্কার বলা যায় স্তর বিন্যাস। বিদ্যমান শিক্ষাস্তর চারটি (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা) কে ভেঙ্গে এ শিক্ষানীতি তিনটি স্তরের সুপারিশ করেছে। নতুন স্তর বিন্যাস হলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। এর সাথে প্রাথমিকের আগে যোগ করেছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে। আগের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। মাধ্যমিক শিক্ষা এখন নবম শ্রেণী হতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর উচ্চশিক্ষা আগের মতই থাকছে।এ স্তরবিন্যাস শিক্ষানীতির বিরাট চ্যালেঞ্জ বটে তবে প্রাথমিক শিক্ষায়, এ শিক্ষানীতি রচনার আগে এবং রচনাকালে যে একমুখী শিক্ষার ব্যাপক তোড়জোড় শোনা গিয়েছিলো এবং শিক্ষানীতি কমিটির যে গর্জন ছিলো বিষয়ে অন্তত বর্ষণটা তেমন ছিলো না। সমন্বয়ের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার কথা আসলেও আসেনি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কথা।মাধ্যমিক শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যšত্ম করে, বৃত্তিমূলক শিক্ষা করার একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে, যাতে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা অর্জন না করেও এ স্তরের পরই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। তবে আগের মতই মাধ্যমিক স্তরের সূচনা থেকেই বিভাজন অর্থাৎ বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ভাগ করা হয়েছে। এরপর শিক্ষানীতি উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা, মাদরাসা শিক্ষা ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে আলোকপাত করেছে।তিন মাসের মধ্যে তাড়াহুড়ে করা শিক্ষানীতি সবকিছুর সন্নিবেশ ঘটালেও সবই পুরনো প্যচাল।তবুও আগেকার শিক্ষা নীতি/কমিশনগুলোর অবস্থান যে হিমাগারে সেখানে এটি যাবেনা, নীতি, জাতীয়তা, বিশ্বায়ন, ভবিষ্যতকে সামনে রেখে এটি চুড়ান্ত করে বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়া যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৮, ২০১০

বই নিয়ে এক প্রস্থ (PUBLISHED,3 February2010, Daily destiny)

রুটি মদ ফুরিয়ে যাবেপ্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবেকিন্তু একটি বই অনন্ত যৌবনাযদি তা তেমন বই হয়”বই নিয়ে ওমর খৈয়ামের এ কবিতার পর বলার আর কী থাকতে পারে। বই নিয়ে এমন সময়ে কলম ধরেছি, চারদিকে বই আর বই। বইয়ের আলোচনায় মূখর সবাই। কোনটা দিয়ে শুরু করা যায়। বইয়ের ইস্যুতো কম নয়। প্রতিষ্ঠানে বিনা মুল্যে বই বিতরণ, বইমেলা, কালোবাজারিতে বই, নিষিদ্ধ বই (গাইড) বিক্রি ইত্যদি। এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া যায় আমাদেও বই প্রীতি, বইয়ের গুরত্ব, লেখক, পাঠক, প্রকাশক, বাংলা একাডেমী, লাইব্রেরী ইত্যাদি। প্রতিটি বিষয় ব্যাপক আলোচনার দাবী রাখে।২০১০ এর ফেব্রুয়ারি এখন। নতুন বছর শুরু না হতেই গনমাধ্যম সরব বইয়ের আলোচনায়। জানুয়ারি মাস জুড়েই ছিলো এ সরবতা। পত্রিকার পাতা ওল্টালেই বই। অবশ্য ফেব্রুয়ারিতেও বই নিয়ে শুরু হয়েছে লেখালেখি, গোটা মাস চলবে। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি। বই নিয়ে জানুয়ারির যে সংবাদের কথা বলছি, সেটা ছিলো কোনোটা ইতিবাচক নেতিবাচক। প্রশ্ন জাগতে পারে বই নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ কেনো? কারণ বই মানেই ভালো কিছু। বইয়ের সংবাদের সাথে নেতিবাচক কথাটা খাটেনা। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গত বছরে বইয়ের ধকল খেয়ে এবছরের(২০১০) জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেন। বছরের প্রথম দিন বা তার আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌছানোর অঙ্গীকার করেন। আগে শুধু প্রাথমিক ¯তরেই বিনামূল্যে বই দেয়া হতো, এবার প্রাথমিকের পাশাপাশি মাধ্যমিক ¯তরেও বিনামূল্যে বই দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য ১৯ কোটি বই ছাপাতে মন্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। তার চেষ্টা থাকা সত্তেও তিনি শতভাগ সফল হননি। সব শিক্ষার্থীও হাতে সময় মতো বই পৌঁছাতে পারেননি। বইয়ের নেতিবাচক সংবাদ হিসেবে প্রায় সব পত্রিকায়ই বিষয়টা উঠে এসেছে। এটা নেতিবাচক হলেও ইতিবাচক দিক হলো চেষ্টা আর সদিচ্ছার অভাব ছিলোনা। আর শতভাগ সফল না হলেও ৬৫ ভাগ সফল বলেও ধরা যায়। বাকী ৩৫ভাগ ব্যর্থতার জন্য বা¯তব কারণ ছিলো। অক্টোবরে এনসিটিবির গুদামে আগুন, অফিসারদের ঠিকমতো বই বিতরণ না করা ইত্যাদি। এরমধ্যে আবার ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠান যারা বাজার থেকে বই কিনে থাকে, তারা বাজারে কেনার মতো বই অভিভাবকরা পাননি। ফলে পুরনো বই দিয়েই তাদের শ্রেণী কার্যক্রম চালাতে হয়। আবার এখনো প্রত্যšত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পুরো সেট বই পায়নি। অর্থাৎ বই না পাওয়ার নেতিবাচক সংবাদটি এখনো পাত্রিকার পাতায় লেগে আছে। আমাদের ব্যবসায় অত্যšত সিদ্ধহ¯ত! যেকোন ব্যবসাই হোক। বইয়ের ব্যবসায় এদের জুড়ি মেলা ভার। বই সিন্ডিকেট, বই কালোবাজারী, নিষিদ্ধ বই বিক্রি যার প্রকৃষ্ট প্রমান । সরকার প্রথম শ্রেণী হতে অষ্টম শ্রেণী পর্যšত নোট , গাইড নিষিদ্ধ করেছে। আদালতের রায়ও হয়েছে। এরপরও প্রকাশকরা নাছোড়বান্দা। তাদের ব্যবসায় লোকসান হয়ে যাবে, সুতরাং ছাপানো নোট গাইড বিক্রির অনুমতি দিতেই হবে। অনুমতি ছাড়াই এখন যে বেশিদামে এগুলো বিক্রি করছে তার কথা নাই বললাম। শিক্ষা বা শিক্ষবিজ্ঞান নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা অষ্টম শ্রেণী পর্যšত নোট গাইড নিষিদ্ধের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু এ নোট বা গাইড বই আমাদের সমাজের এতটা গভীরে গ্রথিত হয়েছে, অনেক অভিভাবকরাও নিষিদ্ধের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেনা। গত বার থেকে আবার যুক্ত হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষা। আগে শিক্ষার্থীরা গাইড পড়ে ভালো ফরাফল করেছে এবারও ভালো ফলাফলের জন্য চাই গাইড চাই নোট। অনেকে অভিভাবকই হতাশায় পড়েছেন। অভিভাবকদের এ হতাশা দূরীকরণ আর নোট গাইড নিষিদ্ধের মূল উদ্দেশ্য তখনি সাধিত হবে যখন শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে ভালোভাবে বই পড়াবেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিবেন। ধরে ধরে প্রত্যেকটা বিষয় বুঝিয়ে দিবেন, প্রয়োজনে লিখে দিবেন। অন্যথায় নোট গাইড নির্ভরতা কমবেনা। অভিভাবকদের হতাশা কাটবেনা। প্রকাশনা সংস্থাগুলো চুরি করে হলেও এগুলো বিক্রি করবে। তখন পুরো পরিকল্পনাই ভে¯েত যাবে।বই নিয়ে এসব নেতিবাচক হতাশার কথা যখন বলছি, তখনি আশার আলো নিয়ে হাজির বইমেলা। গনমাধ্যমে সব খবর ছাপিয়ে প্রধান্য পেয়েছে বইমেলা। একুশের বইমেলা , ঐতিহ্যের বইমেলা, বাংলা একাডেমীর বইমেলা। ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বইমেলা। ফেব্রুয়ারি মানেই বই মেলার মাস। গোটা বছর ফেব্রয়ারির পথ পানে চেয়ে থাকি। বই প্রেমিক মানুষের মনের ক্ষুধা মেটাতে, নতুন লেখক পাঠক উপহার দিতে আসে ফেব্রুয়ারি। আসে বইমেলা।বাংলা একাডেমী চত্বরে লেখক পাঠকের মিলন মেলা। এ বই মেলার ইতিহাস আনেক আগের। বহু আগের বলা যাবেনা। বইমেলার সাথে অর্থাৎ বইমেলা শুরুর সাথে যে মানূষটির কথা সর্বাগ্রে চলে আসে তিনি চিত্তরঞ্জন সাহা। মুক্তধারা প্রকাশণীর কর্ণধার। শরুটা করেছেন চিত্তনঞ্জন বাবু নিজেই।১৯৭০ সালের২১ ফেব্রুয়ারি, বাংলা একাডেমীর সামনের ফুটপাথে, একেবারে চট বিছিয়ে বইয়েরপসরা সাজিয়েছিলেন। সে এক কূঁড়িই আজ বিশাল বটবক্ষ।বইমেলার বিশ্বে বাংলাদেশের একুশের বইমেলাই একমাত্র যা মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য আšতর্জাতিক বই মেলার কথা বলা যেতে পারে। প্রথমেই উঠে আসবে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা। জার্মানীর ফ্রাংকফুর্টে আনুষ্ঠিত হয় বলে এর নাম ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে মাত্র পাঁচদিনের জন্য এ মেলা বসে। এ মেলার বয়স প্রায় পাঁচশ বছর। আয়োজক জার্মান পাবলিশার এন্ড বুক সেলার এসোসিয়েশন। এ মেলায় বিশ্বের নামিদামি লেখকদেও সমাবেশ ঘটে।অনেক দেশের প্রকাশকরা অংশ নেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তরের বই প্রেমী মানুষ ছুটে যান এ বইমেলায়।করকাতার বইমেলাকে ঠিক একই কাতারে শামিল করা যেতে পারে। ১১/১২ দিনের বইমেলা। এ বছরের মেলা এখন কলকাতায় চলছে। অনুষ্ঠিত হয় প্রত্যেক বছরের জানুয়ারির শেষ বুধবার হতে ফেব্রুয়ারির প্রথম রবিবার। কলকাতার এবারের বইমেলার চমৎকারিত্ব একটু অন্যরকম। রবীন্দ্রনাথের দেড়শ তম জন্ম বর্ষে মেলা। আšতর্জতিকতার প্রকৃত রূপ দিতে প্রত্যেক বছর বিশ্বেও বিভিন্ন দেশ এর থিম কান্ট্রি থাকে। এবারের থিম কান্ট্রি মেক্সিকো। মেক্সিকো উদযাপন করছে তাদের স্বধীনতার শত বছর।এসব বইমেলার কথা শুনে হিংসে হলেও আমাদের বইমেলার স্বাতন্ত্র্য আমাদের কাছে। অনেকেই একে আšতর্জাতিক রূপ দেয়ার কথা বলেন। অনেকে আবার নিজস্ব প্রকাশকদের দ্বারাই বইমেলা হোক তা চান। এখানে আমাদের প্রকাশকদের স্থানের ই সংকুলান হয়না। আšতর্জাতিকতার ক্ষেত্রে যেটা বলা যায়, প্রত্যেক বছর ডিসেম্বরে আšতর্জাতিক বইমেলার নামে যে মেলাটা রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে হচ্ছে, এবার হলো সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে, এ মেলার স্থায়ী ভেন্যূ নির্ধারন করে প্রকৃতই একে আšর্জাতিক বইমেলায় রূপ দেয়া যেতে পারে।একুশের বইমেলায় আসি। বইমেলার সাথে জুড়ে দেয়া একুশ শব্দটি আমাদের গৌরবের। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য। সংগ্রামের এক দীপ্ত চেতনা। একুশ ১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছে, পারেনি। তীব্র আন্দোলন আর শহীদের বিনিময়ে পেয়েছি বাংলা। বাংলার দামাল ছেলেরা সে যে জেগে উঠেছিলো ১৯৭১ এর স্বাধীনতার মাধ্যমেই তার সমাপ্তি হয়। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে শহীদদর স্মরনেই বইমেলা। ১৯৫২ এর পর ১৯৫৫ তে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমী। বর্তমান বাংলা একাডেমী ভবনের আগের নাম ছিলো বর্ধমান হাউজ। বাংলা একাডেমীর মাঠজুড়ে তাই বইমেলা। এ মাঠে ও সংকুলান হয়না। চিত্তরঞ্জন বাবু এক থেকে এবারের স্টল সংখ্যা ৪৫০। মেলা নিয়ে অভিযোগ অনুযোগের শেষ নেই। ভালোবাসার জিনিসকে সবাই সুন্দরভাবেই পেতে চায়। বইমেলায় যদি বই স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা না যায়, স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা না যায়। ধুলোবালিদেরই যদি মেলা হয়, অভিযোগ থাকাই স্বাভাবিক। সেটা না হয় মানা যায়। কিন্তু স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রের অনিয়ম কীভাবে মানা যায়। আমরা জানিনা এ অভিযোগ কতোটা সত্য। লটারি যদি করলে তা যথার্থই করা উচিত। মাঠের সুন্দও ব্যবস্থাপনাও আবশ্যক। বর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখবে।ডিজিটাল বাংলাদেশের শ্লোগান ঘোষিত হয়েছে। বইমেলাকেও ডিজিটালের রূপ দিতে কতগুলো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিশ্ববাসী বইমেলার আপডেট সংবাদ জানতে পারবে- িি.িবশঁংযবুনড়রসবষধ.রহভড়, িি.িবশঁংযবৎনড়র.পড়স, িি.িনড়রধিষধ.পড়স, ।আমাদের মুল বিষয় বই। মেলা হচ্ছে বইয়ের। বইকে আমরা কিভাবে দেখছি। অনেকেই আমাদের ব্যাপারে অভিযোগ করেন আমরা বই পড়িনা।সৈয়দ মুজতবা আলী যেটা তার বইকেনা প্রবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, মহিলা তার স্বামীর জন্মদিনের উপহার কিনছে, দোকানি তাকে এটা ওটা দেখাচ্ছে, শেষে একট্ াবই দেখিয়ে বললো এটা নিতে পারেন। মহিলা কিছুটা বিব্রত হয়ে ’ সে ও তো ওর একখানি আছে” অর্থাৎ আমাদের কাছে একটা বই ই যথেষ্ট।আমাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে দেখা যায় একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যšত আমরা বই পড়ছি। সেটা ছাত্র জীবনে পরীক্ষায় পাশের জন্য পড়া। কর্মজীবনে বই পড়ার সময় কোথায়, পড়ার দরকারই বা-কী। যাদের সামর্থ্য আছে বই কিনিনা। অথচ অন্যান্য জাতি বই পড়ায় অভ্য¯ত। ভ্রমনে বের হলেও তাদের সঙ্গী বই। মার্কটোয়েনের কথাতো সবাই জানি, বই ঠাসা তার ঘর, মেঝেতে পা ফেলার আয়গা নেই। পড়ার জন্য বই ধার করে এনে ফেরত না দিয়ে গড়েছে লাইব্রেরী। কবি জসীম উদিদন যেটা বলেছেন, চুরি করে হলেও বই পড়। তিনি বইকে বলেছেন মনীষীদের চিঠি। বড় বড় লেখক, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক আমাদের কাছে চিঠি লেখে গেছেন। সে চিঠি আমরা না পড়লে কারা পড়বে। বই পড়া অভ্যাসের বিষয়। এটা সু অভ্যাস। এঅভ্যাস থাকলে কখনো মানূষ নিঃসঙ্গ হয়না। একাকীত্বে পড়েনা। কারণ তার বন্ধু বই। যে তাকে ২৪ ঘন্টা সাহচর্য্য দিবে। বুড়ো সময়ের কথা চিন্তা করা যাক। যখন কেউ সঙ্গ দিবেনা। বই ই হবে একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু যার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেনি, ছোট বেলায় বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতা হয়নি, বুড়ো অবস্থায় ইচ্ছে করেও সে বইয়ে মনযোগ দেয়া সম্ভব নয়।একটা বইকে কতভাবে চিত্রিত করা যায়-বই একটা বিশ্ববিদ্যালয়, জ্ঞানের ভান্ডার, মনের খোরাক, বিনোদনের মাধ্যম, সময় কাটানোর শ্রেষ্ঠ উপায়, জীবন সমস্যার সমাধান, পরীক্ষায় পাশ,একটা চাকরি সর্বোপরি সুন্দর একটা জীবন। আমরা জ্ঞানী তাকেই বলি যে জানে। আর তাকে এ জানানটা দেয় বই। বই ছাড়া জ্ঞানী হওয়া সম্ভব নয়। ভালো রেজাল্ট করার জন্যও প্রয়োজন বই পড়া। লেখতে চাইলে শর্ত হলো বই পড়া। এক পৃষ্ঠা লিখতে হলে দশ পৃষ্ঠা পড়া দরকার। বই যারা লিখেন অনেক তপস্যা করে লিখেন। পৃথিবীর সামান্যই আমরা দেখছি, জানি। গোটা পৃথিবীতে আমাদের জানার ও দেখার বাইরে অনেক জিনিস রয়েছে। বই না পড়লে আমরা এসব জানবো না। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য আছে লেখকরা এসব কিছু খুজে বের করে আমাদের জন্য তৈরি করেন।প্রতিযোগিতার বিশ্বের কথা আমরা বলি। এ প্রতিযোগিতা জ্ঞানের। আজকের পৃথিবীর যে জাতি জ্ঞানে সমৃদ্ধ প্রতিযোগিতার দৌড়ে তারাই এগিয়ে। জাতি হিসেবে আমাদেও টিকে থাকতে হলে সে জ্ঞানের দৌড়ে আমাদেও ও অংশ নিতে হবে। পড়তে হবে বই।বই নিয়ে এ লেখাটা কবি জসীম উদ্দীনের ” আরো বই পড়–ন” প্রবন্ধের চুম্বক একটা অংশের মাধ্যমে শেষ করছি-” আপনারা বই কিনলে আর ও কি হবে জানেন? দেশের লেখকরা বই বিক্রি থেকে পয়সা পাবেন। দেশে একদল স্বাধীন-মত লেখক তৈরী হবে। তখন তারা যা ভাববেন তাই লিখতে পারবেন। দুর্বলের হয়ে, নিপীড়িতের হয়ে লড়াই করতে পারবেন। আপনাদের আশা আকাংখার আদর্শবাদের তারা রূপ দিতে পারবেন। দেশের অধিকাংশ লেখককে যদি জীবিকার জন্য সরকারের কোন চাকরী করতে হয়, তবে সেই সরকার কোন অবিচার করলেও লেখক দাঁড়াতে পারবেননা। লেখক স্বাবলম্বী হলে সে তা আপনারই লাভ। সরকারের সমালোচনা কওে তবে জেলে যেতে হবেনা। লেখকের বইগুলো সেই কাজ করবে। রুশো, ভলটেয়ারের লেখাগুলি তাদের দেশে মহা পরিবর্তন এনেছিলো।”এখন আমরা বই পড়বো কী পড়বোনা আমরাই বিচার করবে।